শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৭:৫২ অপরাহ্ন

সেলিম মোরশেদের গল্প – আমার কিছু অভিজ্ঞতা

সেলিম মোরশেদের গল্প – আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার কিছু অভিজ্ঞতা

সেলিম মোরশেদের গল্প সম্পর্কে আমার
কিছু অভিজ্ঞতা : অলোক বিশ্বাস

যে টেক্সট পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে বারবার অনেক কিছুর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, সেরকম টেক্সট থেকে বহুদূরে অবস্থান করছে কথাকার সেলিম মোরশেদের গল্প, উপন্যাস। বহু তোলপাড় লক্ষ্য করেছি তাঁর গল্পে। ঝড়ের গতিতে তাঁর টেক্সট বা এর বয়নশৈলি পাঠ করা যায় না। 

অনেকে হয়তো বলবেন, সে তো আগেও দেখা গেছে অনেকের গল্পে। কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, পীযূষ ভট্টাচার্য, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, আল মাহমুদ, উদয়ন ঘোষ, অতীন্দ্রিয় পাঠক, অরূপরতন বসু, সুবিমল মিশ্র, সুবিমল বসাক, হরিয়ানার গুরগাঁওয়ের রবীন্দ্র গুহ বা ঝাড়খণ্ডের অজিত রায় আর বাংলাদেশের জাকির তালুকদার সহ ব্যতিক্রমী নতুন প্রজন্মের কথাকারদের লেখার এটাই অন্যতম প্রধান প্রবণতা। এঁদের লেখা নবকল্লোলিয় বা বাংলাদেশ কলকাতাসহ বাণিজ্য পত্রিকার গল্পের ধারায় লেখা নয়। আগে এরকম দেখা যাক বা পরে, বাংলা গল্পের এই ধারা সাম্প্রতিক কালে আরও বহুমাত্রিকতা অর্জন করেছে। এই বহুমাত্রিক প্রবণতাই সেলিম মোরশেদের গল্পের অন্যতম শৈলি।
#
কবিতার মতোই গল্প উপন্যাসের মাল্টি- ডাইমেনশনালিটি তথা বহু রকমভেদের সঙ্গে আমরা সকলেই কমবেশি যাপন করি। এর মধ্যে ২টি বিশেষ রকমভেদ নিয়ে অনুসন্ধানী পাঠকরা চর্চা করে এসেছেন বহুকাল ধরে। একটি হলো গড়পড়তা গল্পের ধারা বা গতানুগতিক পাঠক ও বাণিজ্য রুচির অনুসারী ধারা।

অন্যটি প্রতিগল্পের বা সমান্তরাল অথচ ইনস্টিটিউশনালাইজড নান্দনিকতা থেকে স্বেচ্ছায়, সচেতনতায় অ্যালিয়েনেটেড প্রবাহ। ‘বিভাজন’ অভিধাটি ব্যবহার না করেও বলা যায়, এই দুই ধারার মধ্যে প্রভেদগত মাত্রা দুই ধারাকে কখনো বৈপরীত্য বা বিরুদ্ধ গল্প শৈলিতে পরিণত করেছে। এই দুই ধারার লেখকদের মানসিক এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান একেবারেই ভিন্ন, কিছু পারস্পরিক সম্পর্ক সত্ত্বেও।

একটি ধারাকে যদি বলা যায় কম্প্রোমাইজাল, তবে অন্যটিকে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে প্রথাবিরোধী, প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী অর্থাৎ নন- কম্প্রোমাইজাল। গড়পড়তা লেখকদের গল্পে অনুসন্ধানের সীমাটি কতোগুলি লিখিত অলিখিত শর্তে বা রেগুলেশনে নির্ধারিত থাকে। রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক, সাংবিধানিক ক্লজের প্রতিটি স্থিতিশীল রীতি মুখস্থ রাখতে হয় একজন গড়পড়তা লেখককে। এটাই তাঁদের নিয়তি। তাঁদের গল্পে প্রাতিষ্ঠানিক রীতির অনুসন্ধানের বা প্রবহমান ডিসকোর্সের বাইরের জীবনের খোলনলচে লিপিত হতে পারে না। ত্রিস্তরিয় মধ্যবিত্ত মানুষের ছলাকলাই সেখানে প্রাধান্য পায়।

চিরকালীন প্রেম-দুঃখ-বিরহ বিচ্ছেদ
সংসারিক লাঠালাঠি, স্বামী-স্ত্রীর দ্বৈত প্রেমের পরকীয়া কাহিনি, প্রতিদিনের আরাধ্য যৌন মিলনের দৃশ্য, কিছুটা রাজনৈতিক ও ধর্মের সুড়সুড়ি, সামাজিক পিএনপিসি, ইন্টার-প্রাতিষ্ঠানিক লাড্ডু খাওয়াখায়ী, কখনো যৌন কর্মীর অপরিণত এবং মিথ্যা বয়াননের আনন্দ অনুভূতি, শহর সভ্যতার দুর্নীতির রিল্যাক্স করা বিবৃতি, কখনো একাকিত্বজনিত অপরাধ প্রবণতার এবং অন্যান্য কিছু সামাজিক রাজনৈতিক আবেগের টানাপোড়েন সহ কিছু ধরতাই সেখানে একই ভাষায় প্রকাশিত হয় গল্পের নাম বদল করে। চিরকালীন আপামর পাঠাভ্যাসসের ইচ্ছা ও আবেগের চাহিদা মতোই গড়পড়তা গল্প উপন্যাস লিখিত।

এই কারণে গড়পড়তা সাহিত্যের প্রধান প্রকাশস্থল বিভিন্ন ব্যবসায়িক মিডিয়ার পত্রপত্রিকা। সেইসব পত্রিকায় সাহিত্যের কারবার চলে পাঠক রুচি অনুসারে, পাঠকের স্থিধ চাহিদার সমান্তরাল রেখায়। ওই ধরনের পাঠকদের পূর্বনির্ধারিত আবেগ অভিজ্ঞতার বৃত্ত-ব্যাস পর্যন্ত যে যে সাহিত্য সামঞ্জস্য বজায় রাখবে, তাকেই প্রমোট করবে প্রতিষ্ঠান। এইসবের পাঠকেরা কখনোই সীমার বাইরে যান না এবং প্রতিষ্ঠানের সাহিত্যের সীমার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলাতেই তাঁদের আনন্দ।

নতুন গল্পের জন্য এঁরা রিস্ক নেন না। বাণিজ্যপ্রবণ পত্রিকার দরকার মাত্র ওইসব পাঠক। সেলিম মোরশেদের পাঠকদের চাহিদারেখাগুলো তাঁদের কনসার্ন হতে পারে না কখনো। ফলতঃ ভিন্ন জীবনের নিরীক্ষার গল্প তাঁদের কাছে ব্রাত্য, কারণ সাধারণভাবে সেগুলো বাণিজ্য দেয় না।

বাণিজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্য করতেই হবে। তাঁদের সুপার স্ট্রাকচারটা সেভাবেই নির্মিত। বাণিজ্যই তাঁদের ভিশন, সেই ভিশনের সঙ্গে কন্ট্রাডিক্ট করছে এমন কোনো গল্প উপন্যাস তাঁরা প্রকাশ করতে অপারগ। এতে তাঁদের ব্যবসার ব্যাঘাত ঘটবে। বাণিজ্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই বাণিজ্য ভিত্তিক পত্রিকাগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু অবস্থানের লেখককে প্রতিপালন করতে হয় গরু ছাগল মহিষের মতো। নির্দিষ্ট কিছু লেখক প্রতিপালিত হতে চান, কারণ বাণিজ্যের সারপ্লাস ভ্যালুর ভাগীদার তাঁরাও।

লিখতে লিখতে কর্পোরেট পত্রিকার নিয়তির সঙ্গে সেইসব গড়পড়তা লেখকদের নিয়তিও জড়িয়ে পড়ে অবিচ্ছেদ্যভাবে। তাহলে কি গড়পড়তা লেখকদের খোঁজ বাণিজ্য পত্রিকার পৃষ্টাতেই শুধুমাত্র পাবো ? হ্যাঁ, সেখানে তো অবশ্যম্ভাবীরূপে পাবোই। আর পাবো অনেক লিটল ম্যাগাজিনেও, যেসব লিটল ম্যাগাজিন সচেতন বা অচেতনভাবে মনে করে বাণিজ্য জগতে খ্যাত কোনো কথাকারের লেখা ছাপতে পারলে সেই পত্রিকার মানও বেড়ে যাবে।

সেইসব পত্রিকা তাহলে লাইমলাইটে এসে পড়বে। এটা একটা জটিল সমস্যা। এর সমাধান একমাত্র ঘটাতে পারে প্রকৃত অর্থে লিটল ম্যাগাজিন সেগুলো। অনেকে মনে করেন, গড়পড়তা লেখকরা যদি লিটল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠাতেও লেখেন, তবে দোষের কোথায়। না, এখানে দোষ গুণের প্রশ্নের চেয়ে বড়ো প্রশ্ন হলো অ্যাটিচুড।
#
বলা যায় ভাষা ও ন্যারেটিভের দুনিয়ায় দাস ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থানে চলমান সত্তার ও নিজের বিরুদ্ধে নিজেরই যুদ্ধে নতুন নতুন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে চলেন একজন প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক। আমরা এও জানি, অনেক ফেক প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক আছেন সর্বত্রই ফেক বিপ্লবীর মতোই।

নিজেকে প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলে ঘোষণা দিলেই হবে না, একজন লেখকের লেখা ও তাঁর জীবন যাপনই বলবে তাঁর অবস্থানটি আসলে কোথায়। প্রতিষ্ঠান বিরোধী সাহিত্য বললেই যে সেটা ভালো সাহিত্য হবে তাঁর কোনো মানে নেই। গল্প উপন্যাসের ভেতরে কিছু তীব্র স্ল্যাং আর চিৎকার করে ‘সদর দফতরে কামান দাগো’ বলে তলেতলে সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বড়োবাড়ি সমূহের সঙ্গে ইন্টুমিন্টু চালিয়ে যাওয়া লেখকরা কতোটা প্রতিষ্ঠান বিরোধী, সে বিষয়ে সকলেরই প্রশ্ন।

কলকাতাতে আমি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক দেখেছি যারা আপাদমস্তক উচ্চ মধ্যবিত্ত রসের ভাণ্ডারে নিমগ্ন থেকে অর্থাৎ এলিট জীবন যাপন করে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হয়ে উঠেছেন। প্রতিষ্ঠান মানেই কি শুধু কিছু বাণিজ্যবাহী পত্রিকা ও প্রকাশনা ? আমরা এও জানি, প্রতিষ্ঠান পরিচালিত ব্যবসারও অনেক প্রকারভেদ আছে।

এও সত্য, কলকাতা ও ঢাকার বহু ব্যবসায়িক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে অজস্র গ্রন্থ প্রকাশিত হতে দেখেছি যেগুলো সমান্তরাল সাহিত্যের ধারাতেই লিখিত। এক অর্থে সবকিছুই একটি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান— ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান আর অধঃপতিত প্রতিষ্ঠান। তবে কোনো বিশেষ বিশেষ লাইন, আমরা যেগুলো দেখছি, সেগুলোও পরিবর্তিত হয়, এটাতে কিছু হয়তো স্বস্তির জায়গা থাকে।

এই আলোচনায় সেলিম মোরশেদ কতোটা প্রতিষ্ঠান বিরোধী, কতোটা সেখান থেকে স্কিড করে যাচ্ছেন, সেই আলোচনা করতে চাইনি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বহু উপকরণ তাঁর গল্পে সততার সঙ্গে নিবিড়ভাবে নিবেদিত আছে, এটা আমি স্পষ্টরূপে উপলব্ধি করেছি। আমি মূলত ভালো, অন্যরকম ভালো এবং ভিন্ন মাত্রার গল্পের খোঁজ করেছি সেলিম মোরশেদের লেখা পড়তে পড়তে।

আর তাঁর সাক্ষাৎকার তীক্ষ্ণভাবে বলে দিচ্ছে তাঁর গল্প উপন্যাসের সমস্ত ইঁট কাঠ পাথর লোহা সিমেন্ট শ্রমসহ যাবতীয় ভিত্তিভূমির রসদের গুণমান। সেসবের নিরিখে তাঁর গল্প সম্পর্কে দুচার কথা এসে যেতে পারে।
#
ভিন্ন ধারার গল্পের প্রথম জায়গাটি হলো প্রাতিষ্ঠানিকতা অতিক্রমকারী ভাষার কাঠামো ও কণ্ঠের তীব্রতা। তীব্রতা বলতে সর্বদা শ্লোগান নয়। এই ধরণের গল্পে থাকবে পূর্ববর্তী গল্পের মিথ ভাঙার অমিত প্রবণতা। নতুন নতুন ট্রিটমেন্ট, যা আগে গোচরীভূত হয়নি। ভিন্ন ধারার গল্প হবে মাল্টিডাইমেনশনাল। চরিত্রগুলো কেমন হবে ?

নিশ্চিতভাবে গোল গল্পের চরিত্রের মতো হবে না। ২০০৯ সালে সেলিম মোরশেদের কিছু গল্পের একটি ইংরাজি ভার্সন প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে। সেই গ্রন্থের সম্পাদনা করেছিলেন সৈফুল আজম। তিনি একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও লিখছিলেন ওই গ্রন্থে।

সেখানে সেলিম মোরশেদের গল্পের বৈশিষ্ট এবং এর চরিত্রগুলো কেমন, সে সম্পর্কে অনেক কথা লিখছিলেন, তার কিছুটা রেফার করা যাক— ‘One of the characteristic features Morshed has as a fiction writer, to begin with, is that he retains his urgent wish to break taboos and other forms of social inhibitions in the middle class society. In his fictional endeavours— often made to reflect the taboo-breaking desires in the mind of the writer himself— he lets loose suppressed psychic workings of an individual caught in the collective pull, and lets his characters be much encouraged to get hold of freedom coming out of the constraints of existing systems of rot in our society, certainly not the way characters in a European context often do. In most of his stories, his characters and sometimes the writer himself are found searching for new ethics for their urgent needs, not believing in the existing ethics or codes of morality, in the societies they have come from.’

এই অংশে কোথাও অ্যান্টি-স্ট্যাব্লিশমেন্ট কনসাসনেসের কথা না বলেও, অন্যধারার গল্পের অঞ্চল ও তার চরিত্রগুলো কেমন হবে, তার অংশত, কিন্তু মর্মস্পর্শী চিহ্নসকল দেখানো হলো সৈফুল আজমের রেফারেন্সে। ভালো গল্প নিশ্চিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার সীমা অতিক্রমকারী। এক অর্থে আবহমান গল্পের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিকতা ভাঙার প্রবণতা থাকে অন্য ধারার কথাকারের লেখায়। সাহিত্যের দুনিয়ায় পূর্বতন ট্যাবুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে প্রতিষ্ঠান।

অন্য ধারার গল্প প্রথমেই এখানে আঘাত করে। পশ্চিমবঙ্গে শাস্ত্রবিরোধী গল্প আন্দোলন এবং নতুন নিয়মের গল্পে প্রচলিত গল্পের ছাঁচ ভেঙে ফেলার কথা বলা হয়েছিল। আসলে গল্পের স্ট্যাটিক ট্যাবুকে আঘাত দেওয়া হয়েছিল। নিম সাহিত্য আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা লিখেছিলেন প্রতিসন্দর্ভের গল্প। তাঁদের সাহিত্য ছিল তিতিবিরক্ত সাহিত্য। ইস্পাত কারখানার ফার্নেসের অভিজ্ঞতা পূর্বেকার স্থিতিশীল অনেক ট্যাবু ভেঙে গল্পের আদল তৈরি হলো। বাংলা পোস্টমডার্ন গল্প, গল্পের দাসতান্ত্রিক পরম্পরা ভেঙে দিয়েছে অনেক।
#
বহুমুখী ঘটনার চিত্রায়নে ট্যাবুভাঙা গল্প লেখেন সেলিম মোরশেদ। কোথাও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেই সেটিকে সরিয়ে অন্য একটি বিষয়ের দিকে গল্পের মুখ ঘুরিয়ে নতুন বিষয়টি পাঠকের কাছে ভাবনার একটা ফ্যাক্টর করে তুলছেন। একই গল্পের মধ্যে পৃথক পৃথক বহু এপিসোডের সমন্বয়ে তাঁর গল্প নির্মিত হতে দেখি। 

গল্পে অবস্থিত প্রতিটি এপিসোড পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী এপিসোডের সঙ্গে যেমন সমন্বিত, তেমনি প্রতিটি এপিসোড পৃথক পৃথক তীক্ষ্ণতা ধারণ করে পাঠকের মনকে কখনো হাইপার-টেন্সড করে দিচ্ছে। ‘শিলা, অনন্তে’ গল্পে মহব্বত আলির বৃক্ষ বিষয়ক দুঃখজনক ঘটনাবলী যখন আমরা টানটান দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে চলে এলো মহব্বত আলির স্ত্রী রিজিয়া সুলতানার নানার প্রসঙ্গ এবং নানা মেজবাহউদ্দিন প্রসঙ্গে দ্রুতই চলে এলো আরেক পির গাজী খাঁর হঠাৎ পুত্র বিয়োগ জনিত দুঃখজনক জীবনের প্রসঙ্গ।

এর মধ্যে কিছু অপ-সংস্কারের ব্যাপারও ঢুকে পড়ে পাঠকের ভাবনাকে ধাক্কা দিচ্ছে বারবার, কারণ ওইসব অপ-সংস্কারের দ্বারা গল্পের চরিত্র বিধ্বস্ত। গল্পের একমুখিতা বারবার বর্জিত হচ্ছে। গাজী খাঁর একমাত্র পুত্রের আকস্মিক মৃত্যুর প্রভাব গিয়ে পড়লো নানা মেজবাহউদ্দিনের ওপর। তারও দুই যুবক ছেলের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে গেল পাঠককে বিস্মিত করে দিয়ে।

— “আলিম ট্রেনে কাটা গেলো, বিকেল তিনটায়, জুম্মার দিনে।— দূর থেকে প্রত্যক্ষদর্শী—যারা ঘটনাটা না বুঝে দেখেছিলো, তাদের বিবরণ : বারবার ট্রেন হুইসেল দেওয়া সত্ত্বেও আলিম স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। আলিমের মৃত্যুর সাতদিন পর হালিম : তার মৃত্যু হলো, একটি আকাশ সমান ডাবগাছের তলায় দাঁড়িয়েছিলো…দড়াম করে জোড়াডাব ব্রহ্মতালুর ওপর পড়ে। প্রথমদিকে মেজবাহউদ্দিন এই আক্রোশ প্রতিহত করেন। পরবর্তী সময় মেজবাহউদ্দিনও নাকি প্রতিশোধ স্পৃহায় প্রবৃত্ত হন।” এই প্রতিশোধ ছিলো পির গাজী খাঁর বিরুদ্ধে। মেজবাহউদ্দিনের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর গল্পের ঘটনার তীব্রতা কোথায় গেলো দেখা যাক— “গাজী খাঁর দুটো বড়ো বড়ো ধানের গোলা বস্তুগত কারণহীন দিনের বেলা পুড়ে যায়। নির্ভরতা ভরা যুবতী স্ত্রী মরিয়ম গাজী খাঁকে ছেড়ে মেজবাহউদ্দিনের বাড়িতে কাজ নেয়।

জ্ঞান হারিয়ে গাজী খাঁ তখন পিশাচ! ইহকাল, নয় পরকাল। শুরু করে কুফরি কালাম! শোনা যায় : কদর্য একটি কাকের পেট চিরে একটানে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের একটি বিশেষ অধ্যায় উল্টো করে লিখে, ঢুকিয়ে সেলাই করা হয়। তারপর সেই কাক নোংরা জায়গায় পুড়িয়ে, তওবা, ভস্ম করে, মেজবাহউদ্দিনের সমস্ত বংশ আর স্বজনদের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এই মারাত্মক অবস্থার ভেতর রিজিয়া সুলতানার বিয়ের সম্বন্ধ আসে।” এই গল্পের শুরুতে দেখি, বিশাল বৃক্ষসম্পদ বা বৃক্ষদৃশ্য সহ প্রশস্ত বাড়ি পেয়েও মহব্বত আলি তৃপ্ত নন। ব্যাপক সমৃদ্ধির মধ্যেও জমির নিস্ফলতা মহব্বত আলিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অধিকাংশ বৃক্ষই নিস্ফলা। মহব্বত আলির মনে হয়েছে— “অধিকাংশ গাছ নিশ্চয়ই জটিল ও গোঁয়ার।” জীবনের কঠিন কঠিন পরিস্থিতি বারবার চিহ্নিত হয়েছে সেলিম মোরশেদের গল্পে। বাড়ির জন্য বিস্তৃত জমি কেনার পর থেকে প্রচুর কষ্ট পেয়েছেন মহব্বত আলি। বহু অর্থ ব্যয় করে মাটি ঢালা সত্ত্বেও বর্ষার ধাক্কায় আর ধেড়ে ইঁদুরের উপদ্রবে পুকুরের পাড় ভেঙে যায়।

পুকুরের মাছেরা পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যায়। বহুরৈখিক বেদনাময় জীবনের ছবি সেলিম মোরশেদের গল্পে পড়তে পড়তে জলে ভরে আসে পাঠকের চোখ। পূর্বে অর্জিত সফলতার প্রতীকগুলো চুরমার হয়ে যায় কতো মানুষের জীবনে, এই সংকট থেকে মুক্তির দিশা কোথায়!! প্রকৃতিকে জয় করে আমরা জীবনকে ধন্য করেছি একসময়— এসমস্তই পরবর্তীতে আইরনিক্যাল অবস্থায় পর্যবসিত হচ্ছে। দুঃসহ একটা শব্দ ব্যবহার করলেন লেখক ‘মিথ্যোপযোগিতা’। সত্যি আমাদের কতো সম্পর্ক মিথ্যোপযোগিতার!! কিন্তু, একজন পাঠকের মনে হতে পারে, ‘শিলা, অনন্তে’ গল্পটি অতিমাত্রিকভাবে সম্প্রসারিত।

অতিমাত্রায় সম্প্রসারণের কারণে মহব্বত আলি, রিজিয়া সুলতানা, গাজী খাঁ-র তীব্র সংকটপূর্ণ অংশগুলো— পরের দিকে শিলা ও মোশতাকের আবেগবহুল শারীরিক প্রেম রোমান্সে ও তাদের বেদনার ছবিতে ম্লান হয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে শিলা এপিসোড নিয়ে একটা পৃথক গল্প হতে পারতো। তাহলে গল্পের পূর্ববর্তী উপাদান নিয়ে যে গল্প থাকতো, সেটা হয়ে উঠতো পৃথকভাবে ব্যতিক্রমী।
#
‘সখিচান’ নিশ্চিতভাবে একটি ব্যতিক্রমী গল্প। চাকরিতে সখিচানের অবসর গ্রহণের দিনে সরকারিভাবে কোনো ফেয়ারওয়েলের আয়োজন হয়নি। কারণ, সে তো একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। মর্গে লাশকাটা ঘরে লাশ কাটে প্রতিদিন দশটা করে। বিভিন্ন কারণে মৃত্যুর লাশ। বংশ পরম্পরায় ডোমের কাজ করে। দীর্ঘদিন ধরে মর্গে লাশকাটার কাজে সে যুক্ত থেকেছে আর আজ সরকার তাকে বিদায় দিচ্ছে ঝাড়ুদার হিসাবে। অবসর গ্রহণের আগে তার বাড়িতেই যেন ফেয়ারওয়েলের ব্যবস্থা করেছে তার পরিবার ও পরিবারের দু’একজন নিকট পরিচিত জন।

স্ত্রী দুলারী, মেয়ে ফাল্গুনীকে একটি লাল কৌটোর মধ্যে রাখা টাকা বের করে আনতে বলে এবং সেই টাকা সখিচানের শিষ্য গোবিন্দকে দিয়ে বলে— ‘যা গোবিন্দ আজ দু’বোতল মদ নিয়ে আয়, ঘরে কষা মাংসও আছে।’ আনন্দে শিস দিয়ে সখিচান বাঁশের বাঁশিটা তখন হাতে তুলে নেয়। সখিচান ডোম পরিবারের মানুষ। গোবিন্দ সখিচানের জাতভাই হলেও সে ডোম নয়, সে হলো মুচি। লাশকাটা ঘরে গোবিন্দ পোস্টিং হলো আর ঝাড়ুদার হিসেবে শেষে সখিচান সরকারি খাতায় নথিভুক্ত হয়েছিল। তো বিদায়ের দিনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফেয়ারওয়েলের আয়োজন হয়নি। সেটা শুধু কি সে অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ বলে ? যারা লাশ কাটে তাদের কি কোনো পদমর্যাদা সরকার স্বীকার করে না ?

একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার আমরা অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে দেখি। সেখানে আনন্দের সময় গৃহের নারীরাও মদ্যপান করে। সখিচানের স্ত্রী শুধু মদ কিনতে টাকাই বার করেনি, সে নিজেও অংশগ্রহণ করছে সখিচানের বিদায় বেলায়। দুলারী মদ্য পানের পটু। সেও জানে চড়া গলায় কোমল সুরে গান ধরতে। এধরণের আচরণ সাধারণত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে দেখা যায় না। ‘সখিচান’ গল্পের শুরু হাসপাতালের লাইটপোস্টের ওপর বসে এক রাতজাগা পাখির দৃশ্যায়নে। গল্পের শেষেও পাখি ধরতে যাবার দৃশ্য। পাখিটিকে কেন্দ্র করে গল্পের ভেতরে বিস্তারিত বলা না হলেও, পাখি ধরার খেলাটি যেন জীবন মৃত্যুর প্রতীক হয়ে গেলো কথাকারের অসাধারণ শিল্প দক্ষতায় এবং জীবনের গভীর উপলব্ধিতে। মদের আসর, অতীত জীবনের ঘটনা, সাম্প্রতিক জীবনের সমস্যা আর বাঁশির সুরের পাশাপাশি ঘনঘন জানলার সম্মুখে লাইটপোস্টের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হচ্ছে, যার তাৎপর্য হয়তো পাঠককে দিতে কিছুটা সময়ের নিলেন লেখক। গল্পের চরিত্রগুলো ঘনঘন লক্ষ্য রাখছে লাইটপোস্টে বসা পাখিটিকে। এর সঙ্গে সখিচানের জীবনের নিশ্চিত কোনো সম্পর্ক আছে, লেখক সেই ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন গল্পে— “সখিচান জানলা দিয়ে লাইটপোস্টের উপর রাতজাগা ঝিমনো পাখিটার দিকে তাকিয়ে হাতে বাঁশিটা তুলে নিলো। সখিচানের তামাটে রঙের শরীরের তলে উড়ুউড়ু মনটা পাখিটার নির্জীব অস্তিত্বকে জাগিয়ে তুলে একাত্ম হতে চাচ্ছিলো।” সখিচানের হাতের বাঁশিটা কি বর্তমান ও ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তার প্রতীক ? মদ খেতে খেতে সখিচানের শালা হারাধনের বন্ধু মনোহরের কাছে সখি চানকে ভিন্ন গ্রহের মানুষ বলেই মনে হচ্ছিল। শীতার্ত বিষণ্ন পাখিটাকে দেখে সখিচানের মধ্যে মৃত্যু সম্পর্কিত প্রশ্ন জেগে ওঠে— “মৃত্যু কী, মৃত্যু কেমন?” দীর্ঘদিন লাশ ঘেঁটেও মরণ কী তা সখিচান আজও বোঝেনি। একসময় জল্লাদের ভূমিকায় একটি নাটকে অভিনয় করেও মৃত্যু কী জিনিস, তার মনে প্রশ্ন জাগে। তবে, তার মনে হয়েছে— ‘মৃত্যু রাতের মতোই নিস্তব্ধ আর মৃত্যু ভাবনাটা মদের মতো।” মদ খেতে খেতে কথার পৃষ্ঠে অনেক কথা এসে পড়ে। হারাধন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বলতে থাকে। একসময় গোবিন্দর মনে হয়, সে বাইরে গিয়ে পাখিটাকে হয় উড়িয়ে দেবে নয়তো ধরে নিয়ে আসবে। ইতিমধ্যে সখিচানের মেয়ে ফাল্গুনী বলেই ফেলেছে, পাখিটাকে এনে দিলে সে এটাকে বাঁচাবে। একসময় গল্পের মধ্যে হঠাৎ রামপিয়ারী এপিসোড আনন্দ ও বিরহ বিষাদের ইঙ্গিত বহন করতে থাকে। সখিচান একবার বনগাঁয় বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে যাত্রাদলে থাকতো অতি সুন্দরী রামপিয়ারী। রামপিয়ারীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে সেখানে মজে গিয়েছিল সখিচান। পরবর্তীতে রামপিয়ারীর স্মৃতি বহু রাত ঘুমোতে দেয়নি সখিচানকে। কবে রামপিয়ারী হারিয়ে গেছে অথবা তার মৃত্যু ঘটেছে। রামপিয়ারীর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের ভেতরে বহুবার সখিচানের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। রামপিয়ারীকে সে ভুলতে পারেনি। আজ সখিচানের বাঁশির সুরের মূর্ছনায় বারেবারে প্রতিফলিত হচ্ছে রামপিয়ারী। সখিচানের সুরের মূর্ছনায় তাকে ঘিরে বসা সবাই অদ্ভুত কল্পনার জগতে পৌঁছে যায় আর তাদের মস্তিষ্কে ক্রমাগত আসতে থাকে বিভিন্ন ভাবনার খোরাক।
#
গল্পের মধ্যে প্রধান চরিত্রদের একাধিকবার অতীতের দিকে চলে যেতে দেখি। অতীত বর্তমানের সাংগঠনিক খেলায় পারদর্শী সেলিম মোরশেদ। বাবা ভাচু ডোম তাকে বলতেন, “লাশ কাটার সময় মনে করবি না বেঁচে আছিস, ভাববি তুই মরা।” কথাটার অর্থ আজও বোঝেনি সখিচান। সত্যি কি বোঝেনি সখিচান ? আসলে পরোক্ষে লেখক, পাঠক সত্তার কাছে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, মৃত্যুচেতনা প্রসঙ্গে। বেশ কিছুক্ষণ পরে মদের আসর ছেড়ে গোবিন্দকে পাখি ধরার কাজে আসতে দেখা যায়। জানলার নিকটে শিশির ভেজা লাইটপোস্টের সামনে এসে পড়ে সে। লাইটপোস্টে ওঠা আর পাখি ধরাটা যেন জীবনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিভাত হয় এখানে। রঙিন পাখিটাকে ধরতেই হবে তার। শত কষ্ট করে লাইটপোস্টে ওঠার মধ্যেও পাখিটাকে তার অপার্থিব মনে হয়— “আর জানলা থেকে সে সময় পাখিটার চোখে হঠাৎ সখিচান এমন কিছু দেখলো যা গোবিন্দ দেখলো না, হয়তো বা গোবিন্দর চোখে তখন যা ধ্রুব গন্তব্য সখিচানের উপলব্ধিতে কোনো এক সত্যের ক্রুর সৌন্দর্য।” এই ‘ক্রুর সৌন্দর্য’ কি আমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না ? হ্যাঁ, পাখিটা একইসঙ্গে জীবন ও মৃত্যু, উভয়ের প্রতীক। গোবিন্দ যতোই ওপরে উঠছে, ততোই পাখিটার এপাশ ওপাশ সরে যাবার পালা দেখছি। জীবনকে ধরতে পারা যাচ্ছে না, ইচ্ছামতো। গোবিন্দর মনে হলো— “তার, ব্র্যাকেট, পাখি এবং পিলার— এই বস্তু চতুষ্টয়ের জ্যামিতিক বিন্যাসের একটা নিয়ম কোথায় যেন কঠিন হয়ে গেলো।” একসময় পাখি ধরার ইচ্ছা ছেড়ে দিয়ে গোবিন্দ লাইটপোস্ট থেকে নেমে আসতে চাইলো, যা পরাজয়ের বার্তাই বহন করছে। এদিকে ঘরের মধ্যে সুরের আবহে সখিচানের নিজের অস্তিত্বের রূপ বদল অনুভূত হচ্ছে, তার মনে হচ্ছে সে রাজা নয়, জল্লাদ নয়, ঝাড়ুদারও নয়, সে আসলে প্রেমিক। অথচ তার ভেতরে মৃত্যুচেতনা সম্পর্কিত ভাবনা একইসঙ্গে প্রগাঢ় হয়ে উঠছে লাশকাটা পেশার কারণে আর রামপিয়ারীর মৃত্যু চিন্তায়। অন্যদিকে সে বাইরের দৃশ্য দেখে কি উপলব্ধি করছে গোবিন্দর চরম পরিণতি ? বাঁশিতে সুর তুললেও পাখি ধরতে লাইটপোস্টে উঠে পড়া গোবিন্দর অবস্থা কিছুতেই সে এড়াতে পারছিলো না। এভাবে পাখি ধরতে যাওয়াটা যদি মৃত্যুর প্রতীক না হতো, তাহলে সখিচানের স্ত্রী দুলারী পাখিটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে কেন ‘রামপিয়ারীর এতো রঙ’ ? একই সঙ্গে মেয়ে ফাল্গুনী পাখিটাকে নিয়ে কল্পনার ঘোরে ঢুকেছিল কারণ পাখিটা তার কাছে বাঁচার প্রতীক হলেও এখন তার অনুভবে “কোনো শাদা রঙের অদৃশ্য অতিশয় গন্ধ।” একসময় সখিচান নিজেই জানলাটা বন্ধ করে দিলো। কেন ? লাইটপোস্ট থেকে গোবিন্দর পড়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী বুঝে গেছিলো সে ? অর্থাৎ মৃত্যুর অনিবার্যতা পাখির কারণে ? স্পৃষ্ট আর্তনাদের মতো অবশেষে বেজে উঠলো সখিচানের বাঁশি। শীঘ্রই তার মাথায় এলো, কাল সকালে আবার তাকে মর্গে যেতে হবে। কেন ? লেখক উত্তরে জানাচ্ছেন, “মৃত্যুর নিশ্চিত পাঠে।” অর্থাৎ গোবিন্দর পাখি ধরার চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুতে সমাপ্তি ঘটলো। মৃত্যুকে সে জয় করতে পারেনি। আর সখিচানের ফেয়ারওয়েল এই চরম বিপর্যয়ে হয়ে উঠলো আইরনিক্যাল। কারণ, সখিচানকে আবারো মর্গে যেতে হবে লাশ কাটতে।
#
সেলিম মোরশেদের ‘নীল চুলের মেয়েটি যেভাবে তার চোখ দুটি বাঁচিয়েছিল’ অসাধারণ একটি গল্প মনে হয়েছে আমার।। এই গল্পে রূপকথার জগৎ নির্মাণের মাধ্যমে শহর সভ্যতার চরম বিপন্ন এক দ্বান্দ্বিক অবস্থার ছবি এঁকেছেন সেলিম। গল্পটিকে পুরনো এক শহরের গল্প নামে লেখক অভিহিত করেছেন, কিন্তু সেই শহরের জগৎজোড়া স্বীকৃতি, তার সভ্যতা ও কৃষ্টির কারণে। সেই শহরের মানুষেরা নিজেদেরকে অতীব মাত্রায় শিক্ষিত ও বিবেকসম্পন্ন মনে করতো। পরবর্তী ঘটনাবলী পাঠের পর আবার সামনের দিকে ফিরে এসে বলা যায় শহরের মানুষের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি জানার পর্ব থেকেই শুরু হয়ে যায় আইরনি। সেই শহরে একদিন একটি আত্মবিশ্বাসী যুবক এসে প্রমাণ করে দেয়, শহরের মানুষের জীবন আসলে ফাঁপা। যেভাবে তারা আত্মগর্ব প্রকাশ করে, যেভাবে নিজেদের বিদ্যাদর্পি মনে করে, আসলে সেসবের সবকিছুই ভুয়ো আর অর্থহীন। যুবকটি পর্যবেক্ষণ করে জেনেছে, তার কাছে এটা প্রমাণিত সত্য যে শহরের মানুষেরা “এক সূক্ষ্ম মিথ্যার পরিপাট্যে নিজেদেরকে স্থাপন করে রেখেছে। মূলত তারা অসহায়, বিভ্রান্ত, বর্বর। উপরন্তু, উপরিকাঠামোর পরিপোষক।” আমাদের মনে পড়ে যায় ‘উলঙ্গ রাজা’র প্রখ্যাত কাহিনি। যুবকটি শহরের অধিবাসীদের বলে, যদি তাদের সূক্ষ্ম পরিপাট্যকে কাচ হিসেবেও মনে করা যায়, তাহলেও সেই কাচ এতোটাই নিম্নমানের যে সেই কাচের গুঁড়ো পাউডার ঘুড়ির মাঞ্জা দেওয়ার পক্ষেও ওয়র্থলেস। যুবকটির তীব্র বিদ্রুপবাণে শহরবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃত অর্থে অন্ধ শহরবাসীরা, যতোই তাদের বৈভব থাকুক না কেন, যতোই তাদের প্রাচীন সভ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার আত্মম্ভরিতা থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তারা যুবকটিকে শহরের পবিত্র একটি উপাসনা কেন্দ্রে টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এই দৃশ্যে পাঠক স্তম্ভিত না হয়ে পারবে না। আত্মগর্বি সভ্যতার বিকলাঙ্গ রূপকে লেখক গল্পের প্রথমেই এভাবে হাইলাইট করলেন। এই নির্মম ঘটনা দেখার বা শোনার পর আজকের শহরবাসীর মনে হতেই পারে, তারাও সম্ভবত, পোস্টমডার্ন কালখণ্ডে এসেও একই অপরাধে অপরাধী। আজকের পুঁজি রাষ্ট্রগুলোতেও একইভাবে বহু মানুষ অন্ধ যা তারা নিজেরা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। আজ যখন বিভিন্ন রাষ্ট্রের শিক্ষা সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র রাজধানীর বুকে কোনো প্রগতিশীল ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়, তখন মনে হয়, লেখক সেলিম মোরশেদ রূপকথার আড়ালে আসলে বর্তমান সভ্যতার শেমলেস নগ্ন স্খলনকে আমাদের চোখের সামনে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়ে অনেক ব্যাপার ফাঁস করে দিলেন। একটি অন্যতর ভালো গল্প এভাবেই তথাকথিত সামাজিক অবস্থানকে সপাটে ধাক্কা মারে। আমাদের পড়ে পাওয়া ধান্দাবাজ চেতনাকে থাপ্পড় মেরে মিথ্যায় পর্যবসিত করে। যে স্ট্যাব্লিশমেন্ট আধুনিক সাহিত্যের বিশাল দাবিদার সেই স্ট্যাব্লিশমেন্টকে ওই পবিত্র উপাসনা কেন্দ্রটির মতোই হাস্যকর বলে বুঝে নিতে আমাদের এক মিনিটও সময় লাগে না। গল্পটি আদতে সভ্যতার অন্ধত্বের রূপটিকে চিহ্নিতকরণের গল্প এবং অবশ্যই প্রতিষ্ঠান বিরোধী দুঃসাহসিক একটি গল্প। উপাসনা কেন্দ্রে যুবকটিকে হত্যার সময় ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হলে গর্বিত শহরবাসী তার লাশটিকে পরের দিন এসে কবরস্থ করবে বলে সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়। এরপর শহরে একজন নীলচুল বিশিষ্ট নারীর আবির্ভাব হয়। সে পরের দিন শহরের বহু মানুষকে জানাতে শুরু করে যে, পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো, যারা পরের দিন যুবকটির লাশ কবর দিতে এসেছিল, তারা দেখে সেই লাশ ওখান থেকে অদৃশ্য। এরপর তারা রক্তের চিহ্ন অনুসরণ করতে করতে বহু মাইল দূরে পৌঁছে লক্ষ্য করে, এক জায়গায় রক্তের ধারা এসে থেমে গেছে। সেখানে একটা বিন্দুর সৃষ্টি হয়েছে। ওই স্থানে তখন তারা কী একটা ভেবে খনন কার্য শুরু করে। নীলচুল বিশিষ্ট নারীটিও এই কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। অবশেষে এক বিশাল গুহা আবিষ্কৃত হয়। গুহার ভেতরে পাওয়া যায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হবার মতো বিভিন্ন আশ্চর্যের বস্তু। শহরবাসীরা প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয় সেইসব দুর্লভ বস্তুসামগ্রী অধিকার করে নিতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তারা লক্ষ্য করে প্রতিটি অত্যাশ্চর্য বস্তুর গায়ে লেখা— “যে অন্ধ আমি কেবল তার।” এটাও একটা বড়ো ছলনার ধাক্কা, যে ধাক্কায় শহরবাসীর মূঢ়তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। সেলিম মোরশেদের গল্পে আমরা বিভিন্ন সময় জাদু বাস্তবতার খেলা লক্ষ্য করেছি। এখানে তার প্রয়োগ হয়েছে বলে মনে হলো আমার। গুহার অভ্যন্তরে বস্তুগুলো অধিকার করার জন্য শহরবাসীরা এতোটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে যে, এতোটাই লোভের বশবর্তী হয়েছে যে, যুবকটির লাশের কথা তারা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়। এমনকি গুহার ভেতরে সম্পদের গায়ে লিপিত বাক্য অনুসারে নিজেদের চোখ উপড়ে ফেলতে থাকে ওইসব সম্পদ পাবার লোভে। গল্পের আইরনি চূড়ান্ত রূপ ধারণ শুরু করে এবার। শহরবাসীর শিক্ষার বাস্তব চেহারাটি যে কতোটা লঘু, কতোটা ফাঁপা, কতোটা ভিত্তিহীন, এই ঘটনায় এটাই প্রমাণিত হয়। প্রতিটি সম্পদের গায়ে লিপিত একই বাক্য যে আসলে শহরবাসীর জন্য অ্যাসিড টেস্ট, তারা ঘুণাক্ষরেও উপলব্ধি করতে না পেরে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনে নিজদের চোখ উপড়ে ফেলে। অল্প সময়ের মধ্যে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারলেও, নতুন বিপত্তি শুরু হয় তাদের জীবনে। কারণ উপড়ে ফেলা চোখগুলো পুনঃস্থাপিত করতে গিয়ে প্রচুর অদল-বদল হয়ে যায়। পরিণামে সামাজিক পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে ব্যাপক ভাঙন। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। পরস্পরকে শনাক্তকরণে বিপত্তি শুরু হয়। শহরে ব্যাপক জটিলতা, অধঃপতন সৃষ্টি হয়। খুন-খারাপি অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুঠপাট থেকে শুরু করে যাবতীয় অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারে বিশাল একটি কাঠের ঘোড়া ছিল। সেটি উড়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী নদীর মাঝখানে নিমজ্জিত হয়। এই অবস্থায় আবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। এইসব ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে দেখতে নীলচুল বিশিষ্ট নারীটির মনে হয়, সেও অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধত্বের গুহার দিকে। এটা উপলব্ধি করা মাত্রই নারীটি ছুটতে শুরু করে নতুন শক্তির জোরে। ছুটতে ছুটতে সে পুবদিকে এসে সূর্যের সম্মুখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে, আর উচ্চারণ করে— “সে দৃষ্টি শক্তি হারাতে চায় না, এমনকি কোনো সম্পদের বিনিময়েও।” গল্পের শুরুয়াত, গল্পের মধ্য পর্যায় এবং সমাপ্তি এক কথায় বিস্ফোরক তথা বিস্ময়কর। অ্যালিগরিক্যাল কবিতার মতোই এই গল্প যেমন অ্যালিগরিক্যাল, তেমনি সামাজিক রাষ্ট্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে একটি গনগনে ফার্নেস বলা যায়।
#
সেলিম মোরশেদের গল্প একাধিকবার পাঠ দাবি করে। অন্যধারার গল্পের ভাষা সরলরেখা ধরে চলে না। গড়পড়তা গল্পের সারল্য এধরণের গল্পে থাকে না বলে, পাঠককে পুনঃপুনঃ পাঠে ফিরতে হয়। আর গল্পের ভেতরে যখন কাব্যিকতা থাকে, সেখানে এসে ভাবনার অবকাশ তৈরি হতে পারে নতুন করে। যে অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো হয়নি, তার আবির্ভাব গল্পে আসতেই গল্প পাঠের পূর্ব অভিজ্ঞতায় ধাক্কা লাগে। সেলিম মোরশেদের গল্প পাঠ করতে করতে পাঠকের মনে বিবিধ বিষয়ে প্রশ্ন জাগবে। কারণ তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো এবং তাদের আচরণ আমাদের চেনাশোনা স্টিরিওটাইপ চরিত্র থেকে আলাদা। লক্ষ্য করার বিষয় যে, একই গল্পের একাধিক পাঠের ফলে গল্পের আলোচনা প্রসারিত হতে থাকে বহুমুখ ধরে। ‘সখিচান’ গল্পে দুলারী চরিত্রটি পৃথকভাবে আলোচনার দাবি রাখে। ‘শিলা, অনন্তে’ গল্পে শিলা-মোশতাকের সম্পর্কের সাইকোলোজি ভিন্ন আলোতে এনে বিচার করা যায়। সেলিমের গল্পে জাদুবাস্তবতার বেশ কিছু উপাদান আমি লক্ষ্য করেছি। ‘সখিচান’ গল্পে ডাক্তারের কথামতো মর্গে লাশ কাটার পর সেলাই করা হলো। কিন্তু ডাক্তার চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে কাটালাশ গাঁগাঁ শব্দ করে উঠলো। সখিচানের বুড়ো বাবা তখন সখিচানকে বলেছিল, ভয় পাস নে বেটা। কিন্তু লাশটা অবিরাম গাঁগাঁ করতে থাকায় ভীত সখিচানকে বাবা ভাচু ডোম বলেছিল, ও মরা, কিন্তু শব্দ করছে যে, সে ও না। সেলিম মোরশেদের প্রতিটি গল্পই ভিন্ন মাত্রার। প্রায় প্রতিটি গল্পই একে অপরের থেকে বিষয় বৈচিত্র্যে পৃথক। গড়পড়তা গল্পের লেখককে একই বিষয়ের অদল-বদল করে বহু গল্প সাপ্লাই দিতে হয়। টিভি সিরিয়ালের মতোই সেইসব খুনসুটি মার্কা লেখা। সেলিমের গল্প সেরকম নয় একেবারেই। তবে সেলিম মোরশেদের কোনো কোনো গল্প নিয়ে ভালো ফিল্ম নির্মাণ করা যেতে পারে বলে আমার মনে হয়। সেলিমের কাটা সাপের মুণ্ডু, সুব্রত সেনগুপ্ত, বাঘের ঘরে ঘোগ, কান্নাঘর, দি পার্ভারটেড ম্যান, রক্তে যতো চিহ্ন ইত্যাদি প্রতিটি গল্পের মধ্যে আছে আরো গল্প। তাঁর ‘সাপলুডু খেলা’ উপন্যাসটি নিশ্চিতভাবে পাঠকের ক্লান্তি কেড়ে নেওয়া কাহিনি। এই আলোচনায় সময়ের অভাবে সেলিম মোরশেদের লেখার বহুরৈখিক সন্দর্ভের আরও অনেক দিক বাদ পড়ে গেলো। পরবর্তী কোনো লেখায় সেইসব বিষয়ে বিস্তারিত যাওয়া যেতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD