মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

সাহিত্য মন্ত্রণালয় চাই -পলক রহমান

সাহিত্য মন্ত্রণালয় চাই -পলক রহমান

সাহিত্য মন্ত্রনালয় চাই -পলক রহমান

ইদানিং খুব জোরেসরে দেশের কবি, কবিতা ও সাহিত্য পাড়ায় সরকারের নিকট একটা দাবী আস্তে আস্তে দানা বেধে উঠছে তা হল আমরা “ সাহিত্য মন্ত্রনালয় চাই”। এর পেছনে কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের দাবীগুলোকে পাশকাটিয়ে যাওয়ারও সুজোগ নেই। সে সাথে আর কিছু কবি এবং সাহিত্য সংগঠন আছে যারা “ সাহিত্য মন্ত্রনালয় চাই” এ দাবী থেকে সরে এসে “সাহিত্য অধিদপ্ত চাই” এমন দাবী উত্থাপন করার চেষ্টা করছে। এমন একটি সমসাময়িক সংবেদনশীল দাবি নিয়ে ভাবতে গিয়ে কোনটা অধিক যুক্তিসঙ্গত “সাহিত্য মন্ত্রনালয়” নাকি- “সাহিত্য অধিদপ্তর” সে নিয়েই আজকের এই আলোচনা। তবে সরকারের কাছে চাইতে হলে বড় আত্মা নিয়ে বড় কিছুই চাইতে হয়। তাইত কথায় বলে সরকারের কাছে “কামান চাইলে অন্ততঃ সুঁইটুকু পাওয়া যেতে পারে”। কিন্তু সুঁই চেয়ে কিছু পাওয়া যাবে বলে সন্দেহ থাকে। কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের এমন একটা সময়ের যুক্তিসঙ্গত দাবী “সাহিত্য মন্ত্রনালয় চাই” এ নিয়ে আজকের এই লেখাটা সকল বোদ্ধাজনদের জন্য এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তুলে ধরলাম।

সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা শাসন বিভাগের কাজের সুবিধার জন্য সচিবালয়ের একটা প্রশাসনিক ইউনিট হল মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী প্রধান একজন মন্ত্রী আর প্রশাসনিক (Administrative) প্রধান একজন সচিব। আর এই মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকে এক বা একাধিক অধিদপ্তর।

What is an administrative department?
An administrative department is a unit in an organization that oversees all its daily operations. This can include overseeing the organization’s financial management, managing its strategic planning, directing its budgeting operations, managing its legal affairs and satisfying its human resource (HR) needs.
(অর্থঃ একটি প্রশাসনিক বিভাগ হল একটি সংস্থার একটি ইউনিট যা তার সমস্ত দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ তত্ত্বাবধান করে । এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধান করা, এর কৌশলগত পরিকল্পনা পরিচালনা করা, এর বাজেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করা, এর আইনি বিষয়গুলি পরিচালনা করা এবং এর মানবসম্পদ (এইচআর) চাহিদা পূরণ করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।)

অপরদিকে অধিদপ্তর হল মন্ত্রণালয়ের অধীন ক্ষুদ্রতর ইউনিট। অধিদপ্তরের প্রধান হিসাবে থাকেন একজন যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিব।

মন্ত্রনালয়ের অধীনে প্রশাসনিক (Administrative) বিষয়টা সরাসরি জড়িত। কিন্তু অধিদপ্তরের অধীনে তা মোটেও নয়। আর এই প্রশাসনিক বিষয়টাই আমাদের কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের এর উন্নয়ন ও জীবনের মৌলিক চাহিদার নিরাপত্তার সাথে প্রতক্ষ্য ভাবে জড়িত। বলতে গেলে সব চেয়ে বেশী প্রয়োজনীয়। এর কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারন তুলে ধরা যেতে পারে। যেমনঃ

# প্রকৃত কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের জন্য প্রয়োজনে ভাতা প্রদানের ব্যাবস্থা করা।
# চিকিৎসা- খুবই সংবেদনশীল একটা ইস্যু। দেখা যায় অর্থনৈতিক টানা পোড়েন যেন সকল কবি সাহিত্যি্‌ ছড়াকার, শিল্পীদের জীবনে একটা চরম অপ্রিয় সত্য বিষয়। বার্ধক্যে এসে তাই অনেকেই অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অকালেই মারা যান। আসলে শিল্পী তো মরেন না মরে যায় কিছু মেধার সম্পদ, প্রতিভা, মেধা এবং অপ্রকাশিত দর্শন ও জাতীর জন্য বিনির্মানের দিক নির্দেশনা জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও দেশত্ববোধ। যা একটা জাতির জন্য বড়ই অনাকাংখিত।
# ঢাকায় এলে সুলোভ মূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা- এ জন্য রাজধানী শহরে এক বা একাধিক আবাসিক ইমারত নির্মান এবং নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করা ছাড়াও প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এর ব্যাবস্থা করা।
# পৃথক ‘কবি ভবন’ সাথে স্বল্প মূল্যে কবিতার আড্ডা ও সংগীতের আসরের জন্য একাধিক অডিটোরিয়াম চাই।
# বই প্রকাশে সরকারী সহযোগীতা পাওয়া।
# পরিচয় পত্র প্রদানের মাধ্যমে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলে তাদেরকে সম্মানের আসনটুকু প্রদান করা।
# গবেষনা কাজে সরকারী সহায়তা পাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

নোটঃ প্রকৃত কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠক ইত্যাদির সম্মানিত ব্যক্তি কারা হবেন বা কাদেরকে বলা হবে, তার একটা গবেষোনালব্ধ ও যুক্তিসংগত সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা, আইন ইত্যাদি মন্ত্রনালয় নির্বাচন করবেন দেশের কতিপয় প্রতিষ্ঠিত কবি লেখক সাহিত্যি ও ছড়াকার যারা ইতিমধ্যেই একুশে পদক প্রাপ্ত, বাংলাএকাডেমি পদক প্রাপ্ত এবং বিদেশ থেকে সাহিত্য সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য জাতিয় ভাবে সম্মানিত তাদের সহায়তায়। এটা করতেও হবে। যা অধিদপ্তর করার এখতিয়ার রাখে না। এ কারনেই “সাহিত্য অধিদপ্তরের” থেকে “সাহিত্য মন্ত্রনালয়ের” দাবীটি অধিকতর যুক্তিসঙ্গত এবং একান্ত সময়ের দাবী।

কেননা সব মন্ত্রনালয়ের অন্তর্গত প্রশাসনিক ভাবে তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সদস্যদের ক্ষেত্রে সাধারনতঃ দেশের অভ্যন্তরে অনেক শহরে এমন অনেক প্রদত্ত সুজোগ সুবিধা দেয়ার ব্যাবস্থা আছে। যেমন, ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জীনিয়ার, শিক্ষক, আমলা ও তাদের সহযোগি মন্ত্রনালয় অন্তর্গত ব্যক্তিবর্গ, রেল, সড়ক ও জনপদ, নৌ, বিমান, যাদুঘর, বন, চা, খনিজ, মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি অনেকের সুলোভ মূল্যে থাকা খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যাবস্থা আছে অনেক আগে থেকেই। কেবল এই সম্মানিত মহলটিই উল্লেখিত সুজোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে কবি লেখক, সাহিত্যিক ছড়াকার, গীতি কবি ও সুরকার, কন্ঠ শিল্পীদের গানে কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল বাঙলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে, যে গান কবিতার উচ্চারিত শব্দ ও সুরে হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ বপন ভাষা আন্দোলনে, স্বাধীনতার যুদ্ধে অকাতরে জীবন দিতেও পিছু পা হয়নি এ জাতি , যে কবি লেখক, সাহিত্যিক ছড়াকার, গীতিকবি ও সুরকার, কন্ঠ শিল্পীদের গান কবিতায় সাহস সঞ্চয় করে ভারতে সরনার্থী শিবিরে কষ্টের জীবনকে হাসি মুখে বরন করেছিল নিরন্ন য়ার নিরস্ত্র বাঙালি, সেই কবি লেখক, সাহিত্যিক ছড়াকার, গীতি কবিদের একটা সেপারেট মন্ত্রনালয় থাকবে না তা হতে পারে না।

শুধু তাই নয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কবি লেখক, সাহিত্যিক ছড়াকার, গীতি কবিগন যত সহস্র কবিতা গল্প, ছড়া প্রবন্ধ গান লিখেছেন বিশ্বের কোন সাহিত্য ও জাতির শব্দকোষের ভান্ডারে আর কাউকে কোন রাষ্ট্রপ্রধান বা জাতির পিতাকে নিয়ে এত শত সহস্র লিখালিখি হয়েছে বলে কেউ কোন দিন কোন দেশ, জাতী বা রাষ্ট্র দাবীও করতে পারবে না। এখানেও আমাদের জাতির এই বাঙালি কবি লেখক, সাহিত্যিক ছড়াকার, গীতি কবিগনের অবদানকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

বরং আমাদের স্বাধীন জাতি এবং এর নির্বাহী প্রধান গর্বের সাথে কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের সম্মানের জায়গাটা এবং তাদের অনুকূলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য জরুরী ভিত্তিতে সকল পদক্ষেপ গ্রহন করবেন সেটাই সকলের একমাত্র চাওয়া। অনেক দেরী হয়ে গেলেও তাড়াতাড়িই এ দাবীর অনুকূলে একটা মন্ত্রনালয় প্রতিষ্ঠিত করে সরকার এ দায় থেকে মুক্ত হবেন এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

বর্তমানে সরকার থেকে ‘সাহিত্য মন্ত্রনালয়’ আদায়ের দাবীতে গাঙচিল সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ, জাতীয় কবি পরিষদ, জাগ্রত সাহিত্য পরিষদ, ঐকতান সাহিত্য ও সংস্কৃতি মঞ্চ, জাতীয় লেখক পরিষদ, বাংলাদেশ পোয়েটস্‌ ক্লাব, কবি ও কবিতার ভূবন, শতরুপা সাহিত্য পরিষদ, অন্যধারা সাহিত্য পরিষদ, পড়শী সাহিত্য পরিষদ, নতুন সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য একাডেমি, সুবচন সাহিত্য পরিষদ (সিলেট), খুলনা সাহিত্য একাডেমি, রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ, চট্টগ্রাম সাহিত্য একাডেমিসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলে এবং উপজেলাথেকে জোর দাবি উঠেছে। তারা এটাকে একটা অরাজনৈতিক আন্দোলনে রুপ দিতে চায় তাদের এই ন্যায্য দাবী পূরণের জন্য।

এ ছাড়াও কিছু কিছু সাহিত্য সংগঠন একটু অন্য প্রক্রিয়ায় সাহিত্য অধিদপ্তরের দাবী তোলার চেষ্টা করছে। এটাকেও সাধুবাদ জানাই। কিন্তু অধিদপ্তরের চেয়ে মন্ত্রনালয় কেন অধিক যুক্তি সঙ্গত সে নিয়ে উপরে আলোচনার আলোকে আশা করব যারা অধিদপ্তর চাইছেন তারাও মন্ত্রনালয়ের দাবিতে এক সামিয়ানার তলে এসে এ আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবেন। আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি, পদবী্র আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাসের অংশ হওয়ার স্বপ্ন না দেখে একত্রে একটা আন্দোলন জোরদার করে কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি এবং এতদবিষয়ে সংগঠকদের অনেক দিনের একটি দাবী প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি এবং সম্মতি আদায় করার জন্য অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাই সেটাই একান্ত কাম্য। আশা করি সরকারও যুক্তি সঙ্গত এ বিষয়টির প্রতি সুনজর দেবেন।

পলক রহমান
বিশিষ্ট কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
সংগঠক, ঐকতান সাহিত্য ও সংস্কৃতি মঞ্চ
১৮ জুন, ২০২৩।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD