রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
গুণিজন না গুণীজন? এস এম শাহনূর

গুণিজন না গুণীজন? এস এম শাহনূর

গুণিজন না কি গুণীজন [] এস এম শাহনূর

বাংলা একাডেমি বাংলা বানান প্রমিতকরণের লক্ষ্যে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দেয় এবং কমিটির সুপারিশ ১৯৯২ সালের নভেম্বরে গ্রহণ করে। অতঃপর পরিমার্জিত নিয়মাবলি চূড়ান্ত করে ১৯৩৬ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত এবং রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র অনুমোদিত নিয়মের ধারাবাহিকতায় সামান্য পরিবর্তন এনে ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে পুস্তিকা প্রকাশ করে। একই সাথে উক্ত পুস্তিকার আলোকে জুন ১৯৯৪, জামিল চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বাংলা বানান-অভিধান’ প্রকাশ করে। অতঃপর, দীর্ঘ দেড় যুগ পর, ২০১২ সালে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এর সহজ পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় । ১৯৯৪ সালের নিয়মে যেখানে তৎসম শব্দ, অতৎসম শব্দ ও বিবিধ এই তিন ভাগে আলোচনা বিন্যস্ত ছিল, ২০১২ সালের নিয়মে তৎসম, অতৎসম, বিবিধ, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান-সংস্থার নাম, ক্রিয়ার রূপ এই পাঁচ ভাগে আলোচনা সাজানো হয়েছে। ১৯৯৪ সালের নিয়মে যেখানে কিছু বানান যেমন: প্রাণিবিদ্যা; গুণিজন; মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধ ছিল। ২০১২ সালের নিয়মে প্রাণীবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা; গুণীজন ও গুণিজন; মন্ত্রীপরিষদ ও মন্ত্রিপরিষদ দুটোই রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, সংস্কৃত ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপ সমাসবদ্ধ হলে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম-অনুযায়ী সেগুলিতে হ্রস্ব ই-কার হয়। তবে এগুলির সমাসবদ্ধ রূপে ঊ-কারের ব্যবহারও চলতে পারে।

পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। প্রচলিত ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলার স্থান পঞ্চম। [ মান্দারিন (চীনা), ইংরেজি, হিন্দি, স্প্যানিশ, রুশ, আরবি অতঃপর বাংলা ] ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। তাই বাংলা বানানের সমতাবিধান ও প্রমিতকরণের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে। প্রণীত হয়েছে প্রমিত বানান বিধি ও আধুনিক বাংলা অভিধান। তবু কোনো কোনো শব্দের বানান নিয়ে বিভ্রান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে! বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য কোন একজন গুণী মানুষকে যখন সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয় তখন ক্রেস্ট কিংবা অনুষ্ঠানের ব্যানারে গুণিজন সম্মাননা/গুণীজন সম্মাননা শব্দ দুটো চোঁখে পড়ে। উক্ত দুটো শব্দের মধ্যে কোনটি প্রমিত? এই বিভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্যে ভাষাবিশেষজ্ঞ, বানানবিশারদ, অভিধানকারকদের অভিমত এবং বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের আলোকে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় পাঠক, দুই বাংলায় সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কিছু বাংলা অভিধানে গুণিজন/গুণীজন বানান কীভারে উপস্থাপিত হয়েছে তা দেখে আসি।

➤যেসকলঅভিধানে গুণিজন/গুণীজন শব্দের ভুক্তি নেই:
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বঙ্গীয় শব্দকোষের (১ম খণ্ড) ৮০৩ পৃষ্ঠায় এবং শৈলেন্দ্র বিশ্বাস এম এ সংকলিত ( শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক আগস্ট ১৯৫৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত) সংসদ বাংলা অভিধানের ২৫০ পৃষ্ঠায়, রাজশেখর বসু সংকলিত চলন্তিক আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধানের ১৫৩ পৃষ্ঠায়
শুধুমাত্র গুণী (-ণিন) শব্দের ভুক্তি রয়েছে। গুণিজন/গুণীজন বলে কোনো শব্দের ভুক্তি নেই।

১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে স্বরবর্ণ অংশ এবং ১৯৮৪ সালের জুনে ব্যাঞ্জনবর্ণ অংশ নিয়ে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের (প্রধান) সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। অভিধানটির ২৬১ পৃষ্ঠায় এবং আহমদ শরীফ সম্পাদিত (প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র ১৩৯৯/ সেপ্টেম্বর ১৯৯২) বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধানের ১৬৬ পৃষ্ঠায় শুধু গুণী শব্দের ভুক্তি রয়েছে।

➤যেসকলঅভিধানে গুণিজন/গুণীজন শব্দের ভুক্তি আছে:
(কলকাতার) পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান অভিধানের (প্রথম প্রকাশ: এপ্রিল ১৯৯৭) ১৮৯ পৃষ্ঠায় গুণী [ণী], গুণীগণ, গুণীজন, গুণীজ্ঞানী, গুণীবৃন্দ, গুণীমানী [ণী নী] শব্দ সমূহের ভুক্তি রয়েছে।

জামিল চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বাংলা বানান-অভিধান’। এটি বাংলা একাডেমি কর্তৃক মুদ্রিত অভিধান (প্রথম প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ ১৪০১/ জুন ১৯৯৪ ) যেখানে শুধু শব্দের বানান প্রদর্শিত হয়, শব্দের অর্থ বা উৎস উল্লেখ থাকে না। অভিধানের ২৩৯ পৃষ্ঠায় গুণিগণ ও গুণিজন শব্দের ভুক্তি রয়েছে। গুণীজন বলে কোনো শব্দ নেই।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আর বাংলা একাডেমি দুই দেশের দুটো ভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে কাজ প্রায় অভিন্ন। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত নিয়ম কানুন সেখানকার অধিবাসীদের যেমন মান্য করতে হয় ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অধিবাসীদেরকেও বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত নিয়ম মানা আবশ্যক।

সংস্কৃত বানানের নিয়মে ইন্ প্রত্যায়ান্ত শব্দ সমাসবদ্ধ হলে ঈ-কারের পরিবর্তে ই-কার হয়। যেমন:
গুণী> গুণিজন
প্রাণী>প্রাণিবিদ্যা
মন্ত্রী> মন্ত্রিপরিষদ

যিনি কিংবা যারা গুণীজন সম্মাননা সঠিক বলে মনে করেন/ লেখেন তিনি ড. মাহবুবুল হক
প্রণীত “খটকা বানান অভিধান” দেখে নিবেন। তাতে “সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম এড়িয়ে এগুলোকে বাংলা সমাসবদ্ধ শব্দ হিসেবে বিবেচনা করলে এসব ক্ষেত্রে বানানে সমতা আসে” বলে বলা হয়েছে। যেমন:
গুণী> গুণীজন,
মন্ত্রী > মন্ত্রীপরিষদ ।

কিন্তু না। এগুলো সংস্কৃত শব্দ হওয়ায় বাংলা সমাসবদ্ধ শব্দ বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। তাতে সমস্যা আরও বাড়বে। ব্যাকরণে অনিয়ম নেই বরং নিয়মের মধ্যে থাকাই সর্বোত্তম। আসুন দেখে নিই।

ই-কার দিয়ে ‘গুণিজন’, ‘প্রাণিবিদ্যা’, ‘মন্ত্রিপরিষদ’
এবং
ঈ-কার দিয়ে ‘গুণীজন’, ‘প্রাণীবিদ্যা’, ‘মন্ত্রীপরিষদ’
উভয় বানান-রূপকেই স্বীকৃতি দিয়েছে
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ১.৫
[পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১২];

কিন্তু, তা সত্ত্বেও, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] অন্তর্ভুক্ত করেছে কেবলই ই-কার দিয়ে ‘গুণিজন’, ‘প্রাণিবিদ্যা’, ‘মন্ত্রিপরিষদ’,

অর্থাৎ বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে গুণীজন’, ‘প্রাণীবিদ্যা’, ‘মন্ত্রীপরিষদ’ শব্দের কোনো ভুক্তি রাখা হয়নি। এ বিষয়টি সাহিত্যের সেবক ও সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত বোদ্ধাদের জানা, অনুধাবন, মানা ও অনুশীলন করা উচিত।

➤লক্ষণীয়:
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের
পরিমার্জিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে। তারও চার বছর পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। তখন ২০১২ সালে প্রবর্তিত বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে পড়ে কিন্তু বিভ্রান্তিকর, এমন বহু শব্দের সাথে উপরোক্ত শব্দগুলোকেও অভিধানে রাখা হয়নি। মজার কথা হচ্ছে, উল্লিখিত শব্দগুলো বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুক্তি না করার যুক্তিসঙ্গত কারণ বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মেই রয়ে গেছে। আরও একটু সহজ করে বলি। উদাহরণ:
(১) যদি শব্দগুলোকে তৎসম শব্দ বলে গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রযোজ্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ১.২,।
➤যে নিয়মটি বলে:
“যেসব তৎসম শব্দে ই ঈ বা উ ঊ উভয় শুদ্ধ কেবল সেসব শব্দে ই বা উ এবং তার কারচিহ্ন ি ু হবে।”
এবং
(২) যদি শব্দগুলোকে অতৎসম শব্দ বলে ধরা হয়, তাহলে প্রযোজ্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ২.১,।
➤যে নিয়মটি বলে:
“সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের কারচিহ্ন ি ু ব্যবহৃত হবে।”

আধুনিক বাংলা অভিধান (বাংলা একাডেমি), পৃষ্ঠা নম্বর ৪০৬। এতে গুণী [ স. গুণ + ইন্ ]
কিন্তু গুণিজন [স. গুণী+জন], বি. গুণী ব্যক্তি ;
গুণিগণ [ স. গুণী+গণ], বি. গুণিবৃন্দ,
আবার গুণীজ্ঞানী [স. গুণী + জ্ঞানী ] এবং গুণিসম্মাননা [স. গুণী+সম্+√মানি+অন+আ(টাপ্)] এরূপ চমৎকার কিছু শব্দ রয়েছে।

➤গুণিজন না কি গুণীজন। কোনটি অধিক গ্রহণযোগ্য?
ব্যাকরণ জানেন ও বোঝেন এমন শতাধিক লেখকের
উত্তর থেকে বাছাই করা কয়েকটি উত্তর:

(১) কলকাতার বেনীপুর সরকারি শিক্ষা কলেজর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, আমলান গাঙ্গুলি [ শুদ্ধ বানান চর্চা] লিখেছেন, “গুণী শব্দটা হল ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ। প্রাতিপাদিক হল “গুণিন্’। প্রথমার একবচন গুণী। সংস্কৃত ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলির প্রথমার একবচনকে বাংলাভাষায় প্রাতিপাদিক ধরে নেওয়া হয়, এবং সেইরূপটিই বাংলাভাষায় ব্যবহৃত হয়। তাই আমরা বাংলায় গুণিন্ লিখি না। “গুণী” লিখি। এখন ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলি সমাসবদ্ধ হলে আবার সংস্কৃত প্রাতিপাদিক রূপ ফিরে আসে। তখন আবার হ্রস্ব-ই-কার হয়। তাই গুণিজন শুদ্ধরূপ।একইভাবে,প্রাণী, কিন্তু প্রাণিবিদ্যা। প্রতিযোগী কিন্তু, প্রতিযোগিতা।নপক্ষী কিন্তু, পক্ষিবিদ্যা ইত্যাদি।”
(২) ফেরদৌস আরা বেগম, [বাংলা বানানের নিয়০ম কানুন।] লিখেছেন, “নিয়মটা হলো : সমাসবদ্ধ শব্দে পূর্ব পদের অন্তের দীর্ঘকার ই- কার হয়ে যায়। যেমন : স্বামীর গৃহ =স্বামিগৃহ। মন্ত্রীদের পরিষদ =মন্ত্রিপরিষদ। মন্ত্রীদের সভা =মন্ত্রিসভা। গুণী যে জন= গুণিজন। কর্মীদের দল=কর্মিদল। তবে স্ত্রীবাচক শব্দে ঈ-কার অপরিবর্তিত থাকবে। স্ত্রীর ধন= স্ত্রীধন। দেবীর মন্দির = দেবীমন্দির।”
(৩) ব্যাকরণের বিন্দুবিসর্গ সহ একাধিক গ্রন্থ প্রণেতা ও শিক্ষক মানবর্দ্ধন পাল লিখেছেন, “গুণিজন ও গুণীজন শব্দ দ্বয়ের প্রথমটিই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি।”
(৪) ব্যাকরণ বিষয়ক লেখক ও বোদ্ধা তপন দেবনাথ বলেন, “বাংলা অ‌ভিধান ম‌তে গু‌ণিজন বা গুণী ব‌্যক্তি সঠিক।”
৫) একাধিক ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রণেতা মোঃ মোস্তফা শাওন লিখেছেন, মন্ত্রিপরিষদ লিখলে গুণিজন একই নিয়মে খাঁটি। [ উল্লেখ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দাপ্তরিক বানান কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ-ই। বিকল্প মন্ত্রীপরিষদ বানানের অস্তিত্ব নেই।]
(৬) লেখক টিএস রহমান বলেন, ‘ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে অন্যকোনো শব্দ বা শব্দাংশ থাকলে সমাসবদ্ধ হয়ে ঈ-কার ই-কার হবে। এটা সাধারণ নিয়ম। সেই নিয়মে গুণিজন (গুণিগণ) হওয়া উচিত। যেমন – প্রাণিবিদ্যা, মন্ত্রিপরিষদ ইত্যাদি।
(৭) লোকজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গবেষক, শিক্ষক ও লেখক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপনের মতে, ” বাংলা ভাষাভাষী সকলের বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ও বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসরণ করা উচিত। বাংলা একাডেমির মতে গুণিজন শব্দ-ই অধিক গ্রহণীয়।”

লেখক

➤লক্ষণীয়:
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের
পরিমার্জিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে। তারও চার বছর পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। তখন ২০১২ সালে প্রবর্তিত বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে পড়ে কিন্তু বিভ্রান্তিকর, এমন বহু শব্দের সাথে উপরোক্ত শব্দগুলোকেও অভিধানে রাখা হয়নি। মজার কথা হচ্ছে, উল্লিখিত শব্দগুলো বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভুক্তি না করার যুক্তিসঙ্গত কারণ বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মেই রয়ে গেছে। আরও একটু সহজ করে বলি। উদাহরণ:
(১) যদি শব্দগুলোকে তৎসম শব্দ বলে গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রযোজ্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ১.২,।
➤যে নিয়মটি বলে:
“যেসব তৎসম শব্দে ই ঈ বা উ ঊ উভয় শুদ্ধ কেবল সেসব শব্দে ই বা উ এবং তার কারচিহ্ন ি ু হবে।”
এবং
(২) যদি শব্দগুলোকে অতৎসম শব্দ বলে ধরা হয়, তাহলে প্রযোজ্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ২.১,।
➤যে নিয়মটি বলে:
“সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের কারচিহ্ন ি ু ব্যবহৃত হবে।”

আধুনিক বাংলা অভিধান (বাংলা একাডেমি), পৃষ্ঠা নম্বর ৪০৬। এতে গুণী [ স. গুণ + ইন্ ]
কিন্তু গুণিজন [স. গুণী+জন], বি. গুণী ব্যক্তি ;
গুণিগণ [ স. গুণী+গণ], বি. গুণিবৃন্দ,
আবার গুণীজ্ঞানী [স. গুণী + জ্ঞানী ] এবং গুণিসম্মাননা [স. গুণী+সম্+√মানি+অন+আ(টাপ্)] এরূপ চমৎকার কিছু শব্দ রয়েছে।

➤গুণিজন না কি গুণীজন। কোনটি অধিক গ্রহণযোগ্য?
ব্যাকরণ জানেন ও বোঝেন এমন শতাধিক লেখকের
উত্তর থেকে বাছাই করা কয়েকটি উত্তর:

(১) কলকাতার বেনীপুর সরকারি শিক্ষা কলেজর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, আমলান গাঙ্গুলি [ শুদ্ধ বানান চর্চা] লিখেছেন, “গুণী শব্দটা হল ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ। প্রাতিপাদিক হল “গুণিন্’। প্রথমার একবচন গুণী। সংস্কৃত ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলির প্রথমার একবচনকে বাংলাভাষায় প্রাতিপাদিক ধরে নেওয়া হয়, এবং সেইরূপটিই বাংলাভাষায় ব্যবহৃত হয়। তাই আমরা বাংলায় গুণিন্ লিখি না। “গুণী” লিখি। এখন ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলি সমাসবদ্ধ হলে আবার সংস্কৃত প্রাতিপাদিক রূপ ফিরে আসে। তখন আবার হ্রস্ব-ই-কার হয়। তাই গুণিজন শুদ্ধরূপ।একইভাবে,প্রাণী, কিন্তু প্রাণিবিদ্যা। প্রতিযোগী কিন্তু, প্রতিযোগিতা।নপক্ষী কিন্তু, পক্ষিবিদ্যা ইত্যাদি।”
(২) ফেরদৌস আরা বেগম, [বাংলা বানানের নিয়০ম কানুন।] লিখেছেন, “নিয়মটা হলো : সমাসবদ্ধ শব্দে পূর্ব পদের অন্তের দীর্ঘকার ই- কার হয়ে যায়। যেমন : স্বামীর গৃহ =স্বামিগৃহ। মন্ত্রীদের পরিষদ =মন্ত্রিপরিষদ। মন্ত্রীদের সভা =মন্ত্রিসভা। গুণী যে জন= গুণিজন। কর্মীদের দল=কর্মিদল। তবে স্ত্রীবাচক শব্দে ঈ-কার অপরিবর্তিত থাকবে। স্ত্রীর ধন= স্ত্রীধন। দেবীর মন্দির = দেবীমন্দির।”
(৩) ব্যাকরণের বিন্দুবিসর্গ সহ একাধিক গ্রন্থ প্রণেতা ও শিক্ষক মানবর্দ্ধন পাল লিখেছেন, “গুণিজন ও গুণীজন শব্দ দ্বয়ের প্রথমটিই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি।”
(৪) ব্যাকরণ বিষয়ক লেখক ও বোদ্ধা তপন দেবনাথ বলেন, “বাংলা অ‌ভিধান ম‌তে গু‌ণিজন বা গুণী ব‌্যক্তি সঠিক।”
৫) একাধিক ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রণেতা মোঃ মোস্তফা শাওন লিখেছেন, মন্ত্রিপরিষদ লিখলে গুণিজন একই নিয়মে খাঁটি। [ উল্লেখ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দাপ্তরিক বানান কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ-ই। বিকল্প মন্ত্রীপরিষদ বানানের অস্তিত্ব নেই।]
(৬) লেখক টিএস রহমান বলেন, ‘ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে অন্যকোনো শব্দ বা শব্দাংশ থাকলে সমাসবদ্ধ হয়ে ঈ-কার ই-কার হবে। এটা সাধারণ নিয়ম। সেই নিয়মে গুণিজন (গুণিগণ) হওয়া উচিত। যেমন – প্রাণিবিদ্যা, মন্ত্রিপরিষদ ইত্যাদি।
(৭) লোকজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গবেষক, শিক্ষক ও লেখক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপনের মতে, ” বাংলা ভাষাভাষী সকলের বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম ও বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসরণ করা উচিত। বাংলা একাডেমির মতে গুণিজন শব্দ-ই অধিক গ্রহণীয়।”

লেখক: এস এম শাহনূর
কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।
[লেখক কর্তৃক সর্ব স্বত্ব সংরক্ষিত ]

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD