মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন

১৫ আগস্টের কুশীলবদের মিথ্যাচার -মো. আব্দুল মালিক

১৫ আগস্টের কুশীলবদের মিথ্যাচার -মো. আব্দুল মালিক

১৫ আগষ্টের কুশীলবদের মিথ্যাচারের একটি নমুনা— মো আব্দুল মালিক
শোকের মাস আগস্টের ১ম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বাঙালি জাতি শোকচিহ্ন হিসেবে কালো ব্যাজ ধারণ করছেন। কয়েকদিন পর এই ব্যাজ আর কেউ ধারণ করেবেন না। কিন্তু শোকের এ মাস শেষ হলেও একেবারে শেষ হবে না। প্রতি বছরই এই মাস, এই দিন বাঙালির জীবনে ফিরে আসবে। জাতি শোক প্রকাশ করবে। এটি বাঙালি জীবনে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আছে, থাকবে। এই শোকের মাস ও দিনের জন্ম হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।
সেদিন যারা এদিনের জন্ম দিয়েছিল তারা এবং তাদের সুবিধাভোগীরা এর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে জাতির সামনে কিছু মিথ্যাচার করেছিল। যা অব্যাহত ছিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ একুশ বছরে অনেক সত্য ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে বা গোপন করা হয়েছে। তদস্থলে মিথ্যা ইতিহাস লেখা ও প্রচার করা হয়েছে। যার দ্বারা নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছিল এবং এখনো হচ্ছে। যদিও বর্তমানে অনেক সত্য প্রকাশ হয়েছে, হচ্ছে তবুও বিভ্রান্তি কাটছে না। তেমনি একটি মিথ্যাচার এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১৫ আগষ্টের কুশীলব এবং তাদের সুবিধাভোগীরা প্রচার করেছিল একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মেজর ডালিমের সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল অন্যায় আচরণ করেছিলেন, তার স্ত্রীকে অপহরণ করতে চেয়েছিলেন ইত্যাদি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মেজর ডালিমসহ সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্রদল এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এই দলের অন্যতম ছিলেন মেজর শরীফুল ইসলাম ডালিম। সেই ডালিম ২০০৪ সালে ‘যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি’ এই নামে ৫৫৮ পৃষ্ঠার একটি বড় বই লিখেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে “নবজাগরন প্রকাশনী”, ৪৩৫/এ, বড় মগবাজার, ঢাকা—১২১৭। বইটির মূল্য ১০৮০ টাকা। এমন একটি বই সম্পর্কে জানতাম। কিন্তু পড়ার সুযোগ হয় নি। সম্প্রতি বইটি সংগ্রহ করে পড়েছি। এই বইতে এ ঘটনার যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন সচেতন, সত্য সন্ধানী পাঠকের সুবিধার জন্য এখানে হুবহু তুলে ধরছি। আশাকরি পাঠক প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। একই সাথে এর নেপথ্যে কারা ছিলেন, ঘটনার জন্য বঙ্গবন্ধু বা শেখ কামাল বা মেজর ডালিম সহ অন্যান্য কুশীলবরা কতটা দায়ী—অনেককিছু জানা ও বোঝার সুযোগ হবে বলে মনে করি।
মেজর ডালিমের বই থেকে ঃ “১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি ঘটে এক বর্বরোচিত অকল্পনীয় ঘটনা। দুষ্কৃতিকারী দমন অভিযানে সেনাবাহিনী তখনও সারাদেশে নিয়োজিত। আমার খালাতো বোন তাহ্মিনার বিয়ে ঠিক হল কর্নেল রেজার সাথে। দু’পক্ষই বিশেষ ঘনিষ্ট। তাই সব ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে হচ্ছিল আমাকে এবং নিম্মীকেই। বিয়ের দু’দিন আগে ঢাকায় এলাম কুমিল্লা থেকে। ঢাকা লেডিস ক্লাবে বিয়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেই বিয়েতে অনেক গণ্যমান্য সামরিক এবং বেসামরিক লোকজন বিশেষ করে হোমড়া চোমড়ারা এসেছিলেন অতিথি হিসেবে। পুরো অনুষ্ঠানটাই তদারক করতে হচ্ছিল নিম্মী এবং আমাকেই। আমার শ্যালক বাপ্পি ছুটিতে এসেছে কানাডা থেকে। বিয়েতে সেও উপস্থিত। বিয়ের কাজ সুষ্ঠুভাবেই এগিয়ে চলছে। রেডক্রস চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারও উপস্থিত রয়েছেন অভ্যাগতদের মধ্যে। বাইরের হলে পুরুষদের বসার জায়গায় বাপ্পি বসেছিল। তার ঠিক পেছনের সারিতে বসেছিল গাজীর ছেলেরা। বয়সে ওরা সবাই কমবয়সী ছেলে ছোকরা। বাপ্পি প্রায় আমার সমবয়সী। হঠাৎ করে গাজীর ছেলেরা পেছন থেকে কৌতুকচ্ছলে বাপ্পির মাথার চুল টানে, বাপ্পি পেছনে তাকালে ওরা নির্বাক বসে থাকে। এভাবে দু’তিনবার চুলে টান পড়ার পর বাপ্পি রাগাম্বিত হয়ে ওদের জিজ্ঞেস করে, চুল টানছে কে ? আমরা পরখ করে দেখছিলাম আপনার চুল আসল না পরচুলা। জবাব দিল একজন। পুঁচকে ছেলেদের রসিকতায় বাপ্পি যুক্তিসঙ্গত কারণেই ভীষণ ক্ষেপে যায়; কিন্তু কিছুই বলে না। মাথা ঘুরিয়ে নিতেই আবার চুলে টান পড়ে। এবার বাপ্পি যে ছেলেটি চুলে টান দিয়েছিল তাকে ধরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বলে, বেয়াদপ ছেলে মশকারী করার জায়গা পাওনি ? খবরদার তুমি আর ঐ জায়গায় বসতে পারবে না। এ কথার পর বাপ্পি আবার তার জায়গায় ফিরে আসে। এ ঘটনার কিছুই আমি জানতাম না। কারণ তখন আমি বিয়ের তদারকি এবং অতিথিদের নিয়ে ভীষণভাবে ব্যস্ত। বিয়ের আনুষ্ঠিকতার প্রায় সবকিছুই সুষ্ঠুভাবেই হয়ে যায়। খাওয়া দাওয়ার পর্বও শেষ। অতিথিরা সব ফিরে যাচ্ছেন। সেদিন আবার টেলিভিশনে সত্যজিৎ রায়ের পুরস্কার প্রাপ্ত ‘মহানগর’ ছবিটি দেখানোর কথা; তাই অনেকেই তাড়াতাড়ি ফিরে যাচ্ছেন ছবিটি দেখার জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই লেডিস ক্লাব প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। মাহবুবের আসার কথা। মানে এসপি মাহবুব। আমাদের বিশেষ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন। আমরা সব একসাথেই যুদ্ধ করেছি স্বাধীনতা সংগ্রামে। কি এক কাজে মানিকগঞ্জ যেতে হয়েছিল তাকে। ওখান থেকে খবর পাঠিয়েছে তার ফিরতে একটু দেরী হবে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনরা সবেমাত্র তখন খেতে বসেছি। হঠাৎ দু’টো মাইক্রোবাস এবং একটা কার এসে ঢুকল লেডিস ক্লাবে। কার থেকে নামলেন স্বয়ং গাজী গোলাম মোস্তফা আর মাইক্রোবাস দু’টো থেকে নামল প্রায় ১০—১২ জন অস্ত্রধারী বেসামরিক ব্যক্তি। গাড়ি থেকেই প্রায় চিৎকার করতে করতে বেরুলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। কোথায় মেজর ডালিম ? বেশি বাড় বেড়েছে। তাকে আজ আমি সায়েস্তা করব। কোথায় সে ? আমি তখন ভেতরে সবার সাথে খাচ্ছিলাম। কে যেন এসে বলল গাজী এসেছে। আমাকে তিনি খুঁজছেন। হঠাৎ করে গাজী এসেছেন কি ব্যাপার ? ভাবলাম বোধ হয় তার পরিবারকে নিয়ে যেতে এসেছেন তিনি। আমি তাকে অর্ভ্যথনা করার জন্য বাইরে এলাম। বারান্দায় আসতেই ৬—৭ জন স্টেনগানধারী আমার বুকে পিঠে মাথায় তাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে ঘিরে দাঁড়াল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমিতো হতবাক। কিছুটা অপ্রস্তুতও বটে। সামনে এসে দাড়াঁলেন স্বয়ং গাজী। আমি অত্যন্ত ভদ্রভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি ? এ সমস্ত কিছুর মানেই বা কি ? তিনি তখন ভীষণভাবে ক্ষীপ্ত। একনাগাড়ে শুধু বলে চলেছেন, গাজীরে চেন না। আমি বঙ্গবন্ধু না। চল্ শালারে লইয়া চল্। আইজ আমি তোরে মজা দেখামু। তুই নিজেরে কি মনে করছস ? অশালীনভাবে কথা বলছিলেন তিনি। আমি প্রশ্ন করলাম, কোথায় কেন নিয়ে যাবেন আমাকে ? আমার প্রশ্নের কোন জবাব নাদিয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন তার অস্ত্রধারী অনুচরদের। তার ইশারায় অস্ত্রধারীরা সবাই তখন আমাকে টানা হেচড়া করে মাইক্রোবাসের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। বিয়ের উপলক্ষ্যে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের বন্দোবস্ত করা হয়েছে; গাড়িতে আমার এস্কট সিপাইরাও রয়েছে। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। একটা বিয়ের অনুষ্ঠান। কন্যাদান তখনও করা হয়নি। কি কারণে যে এমন অদ্ভুত একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হল সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ দেখলাম বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আলম এবং চুল্লুকে মারতে মারতে একটা মাইক্রোবাসে উঠালো ৩—৪ জন অস্ত্রধারী। ইতিমধ্যে বাইরে হৈ চৈ শুনে নিম্মী এবং খালাম্মা মানে তাহমিনার আম্মা বেরিয়ে এসেছেন অন্দরমহল থেকে। খালাম্মা ছুটে এসে গাজীকে বললেন, ভাই সাহেব একি করছেন আপনি ? ওকে কেন অপদস্ত করছেন ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে ? কি দোষ করেছে ও ? গাজী তার কোন কথারই জবাব দিলেন না। তার হুকুমের তামিল হল। আমাকে জোর করে ঠেলে উঠানো হল মাইক্রোবাসে। বাসে উঠে দেখি আলম ও চুল্লু দু’জনেই গুরুতরভাবে আহত। ওদের মাথা এবং মুখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। আমাকে গাড়িতে তুলতেই খালাম্মা এবং নিম্মী দু’জনেই গাজীকে বলল,
ওদের সাথে আমাদেরকেও নিতে হবে আপনাকে। ওদের একা নিয়ে যেতে দেব না আমরা। ঠিক আছে; তবে তাই হবে। বললেন গাজী। গাজীর ইশারায় ওদেরকেও ধাক্কা দিয়ে উঠানো হল মাইক্রোবাসে। বেচারী খালাম্মা, বয়স্কা মহিলা, আচমকা ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন মাইক্রোবাসের ভিতর। আমার দিকে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে থাকলো পাঁচজন অস্ত্রধারী; গাজীর সন্ত্রাস বাহিনীর মস্তান। গাজী গিয়ে উঠল তার কারে। বাকি মস্তানদের নিয়ে দ্বিতীয় মাইক্রোবাসটা কোথায় যেন চলে গেল। মাইক্রোবাস দুইটি ছিল সাদা রং এর এবং তাদের গায়ে ছিল রেডক্রসের চিহ্ন আঁকা। গাজীর গাড়ি চললো আগে আগে আর আমাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি চললো তার পেছনে। এসমস্ত ঘটনা যখন ঘটছিল তখন আমার ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম ও বাপ্পি লেডিস ক্লাবে উপস্থিত ছিল না। তারা গিয়েছিল কোন এক অতিথিকে ড্রপ করতে। আমাদের কাফেলা লেডিস ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাবার পর ওরা ফিরে এসে সমস্ত ঘটনা জানতে পারে লিটুর মুখে। সবকিছু জানার পরমুহূর্তেই ওরা যোগাযোগ করল রেসকোর্সে আর্মি কন্ট্রোল রুমে তারপর ক্যান্টনমেন্টের এমপি ইউনিটে। ঢাকা ব্রিগেড মেসেও খবরটা পৌঁছে দিল স্বপন। তারপর সে বেরিয়ে গেল ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের খুঁজে বের করার জন্য। আবুল খায়ের লিটু আমার ছোট বোন মহুয়ার স্বামী এবং আমার বন্ধু। ও ছুটে গেল এসপি মাহবুবের বাসায় বেইলী রোডে। উদ্দেশ্য মাহবুবের সাহায্যে গাজীকে খুঁজে বের করা।
এদিকে আমাদের কাফেলা গিয়ে থামল রমনা থানায়। গাজী তার গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল থানার ভিতরে। অল্প কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে নিজের গাড়িতে উঠে বসলেন গাজী। কাফেলা আবার চলতে শুরু করল। কাফেলা এবার চলছে সেকেন্ড ক্যাপিটালের দিকে। ইতোমধ্যে নিম্মী তার শাড়ী ছিড়ে চুল্লু ও আলমের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ব্যান্ডেজ বেধে দিয়েছে। সেকেন্ড ক্যাপিটালের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। গাজীর মনে কোন দুরভিসন্ধি নেইতো ? রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে নাতো ? ওর পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। কিছু একটা করা উচিত। হঠাৎ আমি বলে উঠলাম, গাড়ি থামাও! আমার বলার ধরণে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল। আমাদের গাড়িটা থেমে পড়ায় সামনের গাজীর গাড়িটাও থেমে পড়ল। আমি তখন অস্ত্রধারী একজনকে লক্ষ্য করে বললাম গাজী সাহেবকে ডেকে আনতে। সে আমার কথার পর গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে গাজীকে গিয়ে কিছু বলল। দেখলাম গাজী নেমে আসছে। কাছে এলে আমি তাকে বললাম, গাজী সাহেব আপনি আমাদের নিয়ে যাই চিন্তা করে থাকেন না কেন; লেডিস ক্লাব থেকে আমাদের উঠিয়ে আনতে কিন্তু সবাই আপনাকে দেখেছে। তাই কোন কিছু করে সেটাকে বেমালুম হজম করে যাওয়া আপনার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। আমার কথা শুনে কি যেন ভেবে নিয়ে তিনি আবার তার গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। কাফেলা আবার চলা শুরু করল। তবে এবার রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে নয়, গাড়ি ঘুরিয়ে তিনি চললেন ৩২নং ধানমন্ডি প্রধানমন্ত্রীর বাসার দিকে। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কলাবাগান দিয়ে ৩২নং রোডে ঢুকে আমাদের মাইক্রোবাসটা শেখ সাহেবের বাসার গেট থেকে একটু দূরে একটা গাছের ছায়ায় থামতে ইশারা করে জনাব গাজী তার গাড়ি নিয়ে সোজা গেট দিয়ে ঢুকে গেলেন ৩২নং এর ভিতর। সেকেন্ড ফিল্ড রেজিমেন্ট তখন শেখ সাহেবের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। একবার ভাবলাম ওদের ডাকি, আবার ভাবলাম এর ফলে যদি গোলাগুলি শুরু হয়ে যায় তবে ক্রস—ফায়ারে বিপদের ঝুঁকি বেশি। এ সমস্তই চিন্তা করছিলাম হঠাৎ দেখি লিটুর ঢাকা ক—৩১৫ সাদা টয়োটা কারটা পাশ দিয়ে হুস্ করে এগিয়ে গিয়ে শেখ সাহেবের বাসার গেটে গিয়ে থামল। লিটুই চালাচ্ছিল গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল এসপি মাহবুব। নেমেই প্রায় দৌড়ে ভিতরে চলে গেল সে। লিটু একটু এগিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষায় রইলো সম্ভবত মাহ্বুবের ফিরে আসার প্রতীক্ষায়। লিটু এবং মাহ্বুবকে দেখে আমরা সবাই আস্বস্ত হলাম। নির্ঘাত বিপদের হাত থেকে পরম করুণাময় আল্লাহ’তায়ালা আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। লিটু যখন মাহ্বুবের বাসায় গিয়ে পৌঁছে, মাহ্বুব তখন মানিকগঞ্জ থেকে সবেমাত্র ফিরে বিয়েতে আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। হঠাৎ লিটুকে হন্তদন্ত হয়ে উপরে আসতে দেখে তার দিকে চাইতেই লিটু বলে উঠল, মাহ্বুব ভাই সর্বনাশ হয়ে গেছে। বিয়ে বাড়ি থেকে গাজী বিনা কারণে ডালিম—নিম্মীকে জবরদস্তি Gun point — এ উঠিয়ে নিয়ে গেছে। একথা শুনে মাহ্বুব স্তম্ভিত হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীকেই খবরটা সবচেয়ে আগে দেওয়া দরকার কোন অঘটন ঘটে যাবার আগে। গাজীর কোন বিশ^াস নাই; ওর দ্বারা সবকিছুই সম্ভব। মাহ্বুব টেলিফোনের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ টেলিফোনটাই বেজে উঠে। রেড টেলিফোন। মাহ্বুব ত্রস্তে উঠিয়ে নেয় রিসিভার। প্রধানমন্ত্রী অপর প্রান্তে, মাহ্বুব তুই জলদি চলে আয় আমার বাসায়। গাজী এক মেজর আর তার সাঙ্গ—পাঙ্গদের ধইরা আনছে এক বিয়ার অনুষ্ঠান থ্যাইকা। ঐ মেজর গাজীর বউ—এর সাথে ইয়ার্কি মারার চেষ্টা করছিল। উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। বেশি বাড় বাড়ছে সেনাবাহিনীর অফিসারগুলি। সব শুনে মাহ্বুব জানতে চাইলো, স্যার গাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন মেজর ও তার সাঙ্গ—পাঙ্গদের কোথায় রেখেছেন তিনি। ওদের সাথে কইরা লইয়া আইছে গাজী। গেইটের বাইরেই গাড়িতে রাখা হইছে বদমাইশগুলারে। জানালেন প্রধানমন্ত্রী।
স্যার গাজী সাহেব ডালিম আর নিম্মীকেই তুলে এনেছে লেডিস ক্লাব থেকে। ওখানে ডালিমের খালাতো বোনের বিয়ে হচ্ছিল আজ। জানাল মাহ্বুব। কছ কি তুই! প্রধানমন্ত্রী অবাক হলেন। আমি সত্যিই বলছি স্যার। আপনি ওদের খবর নেন আমি এক্ষুণি আসছি। এই কথোপকথনের পরই মাহ্বুব লিটুকে সঙ্গে করে চলে আসে ৩২নং ধানমন্ডিতে। মাহ্বুবের ভিতরে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেহানা, কামাল ছুটে বাইরে এসে আমাদের ভিতরে নিয়ে যায়। আলম ও চুল্লুর রক্তক্ষরণ দেখে শেখ সাহেব ও অন্যান্য সবাই শংকিত হয়ে উঠেন। হারামজাদা, এইডা কি করছস তুই ? গর্জে উঠলেন শেখ মুজিব। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নিম্মী এবং আমাকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। খালাম্মা ঠিকমত হাঁটতে পারছিলেন না। কামাল, রেহানা ওরা সবাই ধরাধরি করে ওদের উপরে নিয়ে গেল। শেখ সাহেবের কামরায় তখন আমি, নিম্মী আর গাজী ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। নিম্মী দুঃখে গ্লানিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। শেখ সাহেব ওকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতে চেষ্টা করছিলেন। অদূরে গাজী ভেজা বেড়ালের মত কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। রেড ফোন। শেখ সাহেব নিজেই তুলে নিলেন রিসিভার। গাজীর বাসা থেকে ফোন এসেছে। বাসা থেকে খবর দিল আর্মি গাজীর বাসা রেইড করে সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয় সমস্ত শহরে আর্মি চেকপোস্ট বসিয়ে প্রতিটি গাড়ি চেক করছে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে কিডন্যাপিং এর খবর পাওয়ার পরপরই ইয়ং অফিসাররা যে যেখানেই ছিল সবাই বেরিয়ে পড়েছে এবং খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে মেজর ডালিম ও তার স্ত্রী নিম্মীকে। সমস্ত শহরে হৈচৈ পড়ে গেছে। গাজীরও কোন খবর নেই। গাজীকে এবং তার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদেরও খুঁজছে আর্মি তন্নতন্ন করে সম্ভাব্য সব জায়গায়। টেলিফোন পাওয়ার পর শেখ সাহেবের মুখটা কালো হয়ে গেল। ফোন পেয়েই তিনি আমাদের সামনেই আর্মি চীফ শফিউল্লাহকে হট লাইনে বললেন, ডালিম, নিম্মী, গাজী সবাই আমার এখানে আছে, তুমি জলদি চলে আসো আমার এখানে। ফোন রেখে শেখ সাহেব গাজীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মাফ চা নিম্মীর কাছে।
গাজী শেখ সাহেবের হুকুমে নিম্মীর দিকে এক পা এগুতেই সিংহীর মত গর্জে উঠল নিম্মী, খবরদার! তোর মত ইতর লোকের মাফ চাইবার কোন অধিকার নাই; বদমাইশ। এরপর শেখ মুজিবের দিকে ফিরে বলল নিম্মী, কাদের রক্তের বদলে আজ আপনি প্রধানমন্ত্রী ? আমি জানতে চাই। আপনি নিজেকে জাতির পিতা বলে দাবি করেন। আমি আজ আপনার কাছে বিচার চাই। আজ আমার জায়গায় শেখ হাসিনা কিংবা রেহানার যদি এমন অসম্মান হত তবে যে বিচার আপনি করতেন আমি ঠিক সেই বিচারই চাই। যাদের রক্তের বিনিময়ে আজ আপনারা জাতির কর্ণধার হয়ে ক্ষমতা ভোগ করছেন সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ভুলুন্ঠিত করে তাদের গায়ে হাত দেয়ার মত সাহস কম্বলচোর গাজী পায় কি করে ? এর উপযুক্ত জবাব আমি আজ চাই আপনার কাছ থেকে। আজ পর্যন্ত আপনি বলতে পারবেন না, ব্যক্তিগতভাবে কোন কিছু চেয়েছি আপনার কাছে কিন্তু আজ দাবি করছি ন্যায্য বিচার। আপনি যদি এর বিচার না করেন তবে আমি আল্লাহর কাছে এই অন্যায়ের বিচার দিয়ে রাখলাম। তিনি নিশ্চয়ই এর বিচার করবেন।
আমি অনেক চেষ্টা করেও সেদিন নিম্মীকে শান্ত করতে পারিনি। ঠান্ডা মেজাজের কোমল প্রকৃতির নিম্মীর মধ্যেও যে এধরণের আগুন লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা আমার কাছেও আশ্চর্য লেগেছিল সেদিন। শেখ সাহেব নিম্মীর কথা শুনে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিলেন,Ñমা তুই শান্ত ’হ। হাসিনা—রেহানার মত তুইও আমার মেয়েই। আমি নিশ্চয়ই এর উপযুক্ত বিচার করব। অন্যায়! ভীষণ অন্যায় করছে গাজী কিন্তু তুই মা শান্ত ’হ। বলেই রেহানাকে ডেকে তিনি নিম্মীকে উপরে নিয়ে যেতে বললেন। রেহানা এসে নিম্মীকে উপরে নিয়ে গেল। ইতিমধ্যে জেনারেল শফিউল্লাহ এবং ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিল এসে পৌঁছেছে। শেখ সাহেব তাদের সবকিছু খুলে বলে জেনারেল শফিউল্লাকে অনুরোধ করলেন গাজীর পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দেবার বন্দোবস্ত করতে। জেনারেল শফিউল্লাহ রেসকোর্স কন্ট্রোল রুমে Operation Commander মেজর মোমেনের সাথে কথা বলার জন্য টেলিফোন তুলে নিলেন,
হ্যালো মোমেন, আমি শফিউল্লাহ বলছি, প্রাইম মিনিষ্টারের বাসা থেকে। ডালিম, নিম্মী, গাজী ওরা সবাই এখানেই আছে। প্রাইম মিনিষ্টারও এখানেই উপস্থিত আছেন। Everything is going to be all right. Order your troops to stand down এবং গাজী সাহেবের পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দাও। অপরপ্রান্ত থেকে মেজর মোমেন জেনারেল শফিউল্লাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলেন কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া অফিসার এবং তার স্ত্রীকে না দেখা পর্যন্ত এবং গাজী ও তার ১৭ জন অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তার হাতে সমর্পণ না করা পর্যন্ত তার পক্ষে গাজীর পরিবারের কাউকে ছাড়া সম্ভব নয়। শফিউল্লাহ তাকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলেন কিন্তু মেজর মোমেন তার অবস্থানে অটল থাকলেন শফিউল্লাহর সব যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে। অবশেষে শফিউল্লাহ ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রধানমন্ত্রীকে Operation Commander এর শর্তগুলো জানালেন। শেখ সাহেবের মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন মেজর মোমেনের সাথে কথা বলতে। আমি অগত্যা টেলিফোন হাতে তুলে নিলাম,
হ্যালো স্যার। মেজর ডালিম বলছি। Things are under control প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছেন তিনি ন্যায় বিচার করবেন।
Well Dalim it’s nice to hear from you. But as the Operation Commander I must have my demands met. I got to be loyal to my duty as long as the army is deployed for anti-miscreant’s drive. The identified armed miscreants cannot be allowed to escort free. As far as I am concerned the law is equal for everyone so there can’t be any exception. Cheif has got to understand this.বললেন মেজর মোমেন।
Please Sir, why don’t you comeover and judge the situation yourself. অনুরোধ জানিয়েছিলাম আমি। There is no need for me to come. However, I am sending Capt. Feroz বলে ফোন ছেড়ে দিলেন মেজর মোমেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই ক্যাপ্টেন ফিরোজ এসে পড়ল। ফিরোজ আমার বাল্যবন্ধু। এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। তুই গাজীরে মাফ কইরা দে। আর গাজী তুই নিজে খোদ উপস্থিত থাকবি কন্যা সম্প্রদানের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত। অনেকটা মোড়লী কায়দায় একটা আপোষরফা করার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী। আমার বোনের সম্প্রদানের জন্য গাজীর বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবার কোন প্রয়োজন নেই। ওকে মাফ করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা হবে আমার জন্য নীতি বিরোধিতা। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি রক্তের বিনিময়ে। আমাদের গা থেকে রক্ত ঝরাটা কোন বড় ব্যাপার নয়। ইউনিফর্মের চাকুরি করি টাকা—পয়সার লোভে নয়। একজন সৈনিক হিসাবে আমার আত্মমর্যাদা এবং গৌরবকে অপমান করেছেন গাজী নেহায়েত অন্যায়ভাবে। আপনিই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। অবৈধ অস্ত্রধারীদের খুঁজে বের করে আইনানুযায়ী তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে। সেখানে আজ আমাদেরই ইজ্জত হারাতে হল অবৈধ অস্ত্রধারীদের হাতে! আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে কথা দিয়েছেন এর উচিত বিচার করবেন। আমরা আপনি কি বিচার করেন সেই অপেক্ষায় থাকব। ক্যাপ্টেন ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে সবার সামনেই বলেছিলাম, দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বিচারের ওয়াদা করেছেন সেক্ষেত্রে গাজীর পরিবারের সদস্যদের আর আটকে রাখার প্রয়োজন কী ? কর্নেল মোমেনকে বুঝিয়ে তাদের ছেড়ে দেবার বন্দোবস্ত করিস। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম ঠিক সেই সময় শেখ সাহেব বললেন, আমার গাড়ি তোমাদের পৌঁছে দেবে। তার প্রয়োজন হবে না চাচা। বাইরে লিটু—স্বপনরা রয়েছে তাদের সাথেই চলে যেতে পারব। বাইরে বেরিয়ে দেখি ৩২নং এর সামনের রাস্তায় গাড়ির ভীড়ে তিল ধারণের ঠাই নেই। পুলিশ অবস্থা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বন্ধু—বান্ধবরা যারাই জানতে পেরেছে আমাদের কিডন্যাপিং এর ব্যাপারটা, তাদের অনেকেই এসে জমা হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আমাদের দেখে সবাই ঘিরে ধরল। সবাই জানতে চায় কি প্রতিকার করবেন প্রধানমন্ত্রী এই জঘণ্য অপরাধের। সংক্ষেপে যতটুকু বলার ততটুকু বলে ফিরে এলাম লেডিস ক্লাবে। মাহবুবও এল সাথে। মাহবুবের উছিলায় সেদিন রক্ষা পেয়েছিলাম চরম এক বিপদের হাত থেকে আল্লাহপাকের অসীম করুণায়। বিয়ের আসরে আমরা ফিরে আসায় পরিবেশ আবার আনন্দ উচ্ছাসে ভরে উঠল। সবাই আবার হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে বিয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কন্যা সম্প্রদান করা হল। তাহমিনার বিয়ের রাতটা আওয়ামী দুঃশাসনের একটা ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে থাকলো। জ¦লন্ত উদাহরণ হয়ে থাকলো আওয়ামী নেতাদের এবং তাদের ব্যক্তিগত বাহিনীর ন্যাক্কারজনক স্বেচ্ছাচার ও নিপীড়নের। কী করে এমন একটা জঘণ্য ঘটনার সাথে গাজী সরাসরি নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পেরেছিল তার কোন যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক পরে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলাম আমাদের কুমিল্লা অপারেশনের পর পার্টির তরফ থেকে শেখ মুজিবের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল আমাদের বিশেষ করে আমার ঔদ্ধত্বের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য। কিন্তু শেখ মুজিব ঐ চাপের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, আর্মি কোন কাঁচা কাজ করে নাই। তারা আইন অনুযায়ী সবকিছু করছে, প্রত্যেককে ধরেছে হাতেনাতে প্রমাণসহ সে ক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি ? তার ঐ কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ আওয়ামী নেতাদের একাংশ। আইনের মাধ্যমে যদি কোন কিছু করা না যায় তবে অন্য কোনভাবে হলেও শিক্ষা তাদের দিতেই হবে এবং সেই দায়িত্বটাই গ্রহণ করেছিলেন সেই সময়ের Top terror and most powerful leadr বলে পরিচিত গাজী গোলাম মোস্তফা। তখন থেকেই নাকি সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি জিঘাংসা মিটাতে। বিয়ে বাড়িতে বাপ্পি এবং তার ছেলেদের মাঝে যে সামান্য ঘটনা ঘটে সেটাকেই সুযোগ হিসাবে গ্রহন করে গাজী চেয়েছিল আমাকে উচিত শিক্ষা দিতে। এ বিষয়ে মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি তার বই ‘বাংলাদেশ! সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রের সংকট’ এ লিখেছেন, “গাজী সমর্থক লোকদের সম্ভবতঃ মেজর ডালিম ও তার স্ত্রীকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল।” ঘটনার পরদিন সকালেই আমার ডাক পড়ল আর্মি হেডকোয়ার্টারসে। সেখানে উপস্থিত হয়েই জানতে পারলাম চীফ আমাকে ডেকেছেন। কিন্তু তার আগেই ডাক পড়ল জেনারেল জিয়ার অফিসে। মেজর হাফিজ তখন PS-Cord to DCAS সেই আমাকে খবর দিল জেনারেল জিয়া আমার সাথে কথা বলতে চান। তিনি আমার অপেক্ষায় আছেন। অনুমতি নিয়ে গিয়ে ঢুকলাম তার অফিসে। গতরাতে কী ঘটেছে তিনি জানতে চাইলেন। সবকিছুই বিস্তারিত খুলে বললাম তাকে। সব শুনে তিনি বেশ উত্তেজিতভাবেই বললেন, This is incredible and ridiculous. This is simply not accepatble. ঠিক আছে দেখ চীফ কী বলে। তার অফিস থেকে বেরিয়ে আসতেই হাফিজ তার ঘরে নিয়ে গেল। নূরও ছিল সেখানে। হাফিজ বলল, দ্যাখো ডালিম; গতরাতের বিষয়টা শুধুমাত্র তোমার আর ভাবীর ব্যাপারই নয়; সমস্ত আর্মির Diginity, pride and honour are at stake মানে আমরা সবাই এর সাথে জড়িত। You go to understand this clearly ok? অন্যান্য সব ব্রিগেডের সাথে আলাপ হয়েছে তারাও এ ব্যাপারে সবাই একমত। This has got to be sorted out right and proper. শেখ মুজিব কী বিচার করবে ? আমরা শফিউল্লাহর মাধ্যমে দাবি জানাবো আর্মির তরফ থেকে। প্রধানমন্ত্রীকে সে দাবি অবশ্যই মানতে হবে। দাবিগুলো আমরা ঠিক করে ফেলেছি। তুমি শফিউল্লাহ কি বলে সেটা শুনে আস তারপর যা করবার সেটা আমরা করব। আর্মি হেডএকায়ার্টারস এ সমস্ত তরুণ অফিসারদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। হাফিজের অফিস থেকেই চীফের অউঈ—কে ইন্টারকমে জানালাম, I am through with DCAS so I am free now to see the Chief. Right Sir. বলে রিসিভার নামিয়ে রাখলো ADC. কিছুক্ষণ পরই ADC হাফিজের কামরায় এসে জানাল চীফ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। চীফের অফিসে ঢুকতেই তিনি আমাকে বসতে বললেন। চেয়ার টেনে বসলাম মুখোমুখি। How are you ? Fine Sir. How is Nimmi ? She is ok Sir, but terribly upset. Quite natural. But she is a brave girl I must say. The way she talked to the prime minister was really commedable. এ সমস্ত কথার পর আসল বিষয়ের উপস্থাপনা করলেন জেনারেল শফিউল্লাহ, দেখ ডালিম গতরাতের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই দুঃখ এবং অনুতাপ প্রকাশ করেছেন। I am also very sorry about the whole affair, শেখ সাহেবতো তোমাদেরও আপনজন। অত্যন্ত স্নেহ করেন তোমাদের দু’জনকেই। তিনি যখন চাইছেন তুমি গাজীকে মাফ করে দাও, তার সে ইচ্ছা তুমি পূরণ করবে সেটাইতো তিনি আশা করছেন। তুমি যদি গাজীকে মাফ কর তবে তিনি খুশী হবেন তাই নয় কি ? স্যার, তিনি আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। পারিবারিকভাবে আমাদের ঘনিষ্ঠতাও আছে; সেটাও সত্য। তিনি ও তার পরিবার আমাদের ভালোবাসেন। কিন্তু নীতির ব্যাপারে আপোষ আমি করতে পারবনা সেটা আপনার সামনেই তাকে আমি বলে এসেছি। And I shall stick to that till the end. Well that’s up to you then. I have nothign more to tell you. Thank you sir.বলে বেরিয়ে এসে দেখি চীফের অফিসের সামনে AHQ —র প্রায় সব অফিসার একত্রিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমার কাছ থেকে জানতে চাইলো চীপ কী বললেন। আমি আমাদের কথোপকথনের সবটাই তাদের হুবহু খুলে বললাম। ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল সবাই। একজন ADC কে বলল,Go and call him out here, we want to talk to him.Ó
ADC—র মাধ্যমে অফিসারদের অভিপ্রায় জানতে পেরে বেরিয়ে এলেন জেনারেল শফিউল্লাহ। সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল। চীপ বললেন, বলো তোমাদের কী বলার আছে ? স্যার, গতরাতের ঘটনা শুধুমাত্র মেজর ডালিম এবং তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। আমরা আজ যেখানে দুষ্কৃতকারী দমনের জন্য সারাদেশে deployed সেই পরিস্থিতিতে বিনা কারণে গাজী ও তার সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে আমাদেরই একজন অফিসার এবং তার স্ত্রীকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনীই নয়; It has compromised the honour and the dignity of the whole armed force particularly army. We can’t take it lying. It has go to be sorted out right and proper.” কথাগুলো বলল একজন। জেনারেল শফিউল্লাহ জবাবে বলার চেষ্টা করলেন, Well the prime minister is personaly very sorry about the whole affair. That’s not enough! শফিউল্লাহকে থামিয়ে দিল একজন।
Now Sir, you being our Chief and the leader have to shoulder your responsibility to uphold the honour and the dignity of this army. সমগ্র সেনা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের ৩টি দাবি আপনাকে জানাচ্ছি।
১। গাজীকে তার সংসদ পদ এবং অন্যান্য সমস্ত সরকারি পদ থেকে এই মুহুর্তে অব্যাহতি দিয়ে তাকে এবং তার অবৈধ অস্ত্রধারীদের অবিলম্বে আর্মির হাতে সোপর্দ করতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে; যাতে করে আইনানুযায়ী তাদের সাজা হয়।
২। গতরাতের সমস্ত ঘটনা সব প্রচার মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে দেশের জনগণকে অবগত করার অনুমতি দিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে।
৩। যেহেতু গাজী আওয়ামী লীগের সদস্য সেই পরিপ্রেক্ষিতে পার্টি প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে মেজর ডালিম এবং তার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
আপনাকে আমাদের এই ৩টি দাবি নিয়ে যেতে হবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে এ দাবিগুলো মেনে নিতে হবে। এই দাবিগুলি আপনি যদি আদায় করতে অপরাগ হন তবে You have go no right to sit on your chair. You will be considered not fit enough to lead this army.”পৃষ্ঠা ৪৩৮ থেকে ৪৪৮
অফিসারদের এই দাবী নিয়ে সেনাপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্রুত সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানের কাছে কিছু সময় চান। অফিসাররা সময় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানের মাধ্যমে বিষয়টি সম্মানজনক সমাধানের বার বার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জুনিয়র সেনাকর্মকতার্রা তা মেনে নিচ্ছিলেন না, পরে জুলাই মাসের শেষ দিকে তদন্ত সাপেক্ষে মেজর ডালিম সহ আট জন অফিসারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সেসময় উপ—সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান সাহেবের ভূমিকা সম্পর্কে মেজর ডালিম লিখেছেন, “বাইরের শোরগোল শুনে জেনারেল জিয়া কখন বেরিয়ে এসেছিলেন আমরা খেয়ালই করিনি। হঠাৎ তিনি তার গুরুগম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, Boys be quite and listen to me, I have heared everything and I appreciate your sentiment. I have also understood the problem. Your demands are just and fair. Shafiullah you must go with their demands to the Prime minister and make him understand the gravity of the situation and suggest him to accept the demands for the greater interest of the nation and the armed forces.পৃষ্ঠা — ৪৪৯
সেনাপ্রধান সম্পর্কে ডালিমের মন্তব্য— “দুঃখ হল, পেশাগত নিজ যোগ্যতায় নয় শেখ মুজিবের বদান্যতায় যারা একলাফে মেজর থেকে জেনারেল বনে গেছেন তারা নিজেদের চামড়া পর্যন্ত বিকিয়ে দিয়ে বসে আছেন শেখ সাহেব এবং তার দলের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল; জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন তেমনি একজন”। পৃষ্ঠা— ৪৫১
চাকুরী থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর মেজর ডালিমকে নিয়ে কর্ণেল হুদা ঢাকায় যান প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখার করার পূর্বে তারা যান সেনা সদর দপ্তরে। সে সম্পর্কে ডালিম লিখেছেন— “ঢাকায় এলাম আমরা। আর্মি হেডকোয়ার্টার্স্ এ চরম উত্তেজনা। শফিউল্লাহ অফিসে নেই। তিনি নাকি অসুস্থ। জেনারেল জিয়া আমি এসেছি জানতে পেরে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে ঢুকলাম তার অফিসে। তিনি সিট থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। স্বল্পভাষী লোক। বললেন, Have faith in Allah. He does everything for the better. This is just the beginning and I am sure manymore heads will roll.” পৃষ্ঠা —৪৫৪
সেদিন রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মেজর ডালিম ও কর্ণেল হুদার সাক্ষাৎ হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার, পার্টি, সেনাবাহিনী ইত্যাদি বিবেচনা করে বাধ্য হয়ে তাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মেজর ডালিমকে বলেন, “তুই আর নূর কাইল আমার সাথে রাইতে বাসায় দেখা করবি।” কিন্তু উনারা দেখা করেননি। কয়েকদিন অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী আবার খবর দিয়ে তাদের নেন এবং বলেন, বিশেষ অবস্থায় তোমাদের ব্যাপারে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমি জানি এতে তোমরা মনোক্ষুণ্ণ। তোমরা চাইলে আমি তোমাদেরকে দূতাবাসে চাকুরীর বা ব্যবসা করার ব্যাবস্থা করে দিতে পারি। তারা সে ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই জানিয়ে চলে আসেন। পৃষ্ঠা— ৪৬০
তারপর ঘটে ১৫ আগষ্টের কলঙ্কজনক ঘটনা।
দেখা যাচ্ছে ঘটনা ছিল মেজর ডালিমের শ্যালকের সংগে তার স্ত্রীর সংগে নয়। আর ঘটনাকারী বংগবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল নয়,গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেরা। অথচ প্রচার ছিল মেজর ডালিম এর স্ত্রীর সাথে শেখ কামালের গন্ডগোল হয়েছে। ধন্যবাদ মেজর ডালিমকে তিনি যাই করেননা কেন? শহীদ কামালের চরিত্রের উপর কোন কালিমা লেপন করেননি বরং তার বইয়ে বংগবন্ধুর সন্তানদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD