বৃহস্পতিবার, ১১ অগাস্ট ২০২২, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
সাহিত্যে রহিম করিম ওয়ার্ল্ড প্রাইজ পেলেন এস এম শাহনূর পর্যটন পুলিশের মিডিয়া উইংস প্রধান আবদুল হালিমকে কবি সাংবাদিকদের ফুলেল শুভেচ্ছা ভুলে ভরা বাংলাদেশের নদী বিষয়ক গ্রন্থগুলো -হাসনাইন সাজ্জাদী বৃক্ষরোপণ ও সবজি চাষে জোর দিচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিউইয়র্ক বইমেলায় সাহিত্যমান বিতর্ক এখন বিজ্ঞান কবিতার কাল -হাসনাইন সাজ্জাদী ‘পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে’ আমার কয়েকটি কথা -হাসনাইন সাজ্জাদী আনন্দকাব্য না বিজ্ঞানচিন্তা? বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপির মিডিয়া শাখায় নতুন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হালিম। ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরে
১০ সেপ্টেম্বর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জন্মদিন – লিয়াকত হোসেন খোকন

১০ সেপ্টেম্বর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জন্মদিন – লিয়াকত হোসেন খোকন

১০ সেপ্টেম্বর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জন্মদিন - লিয়াকত হোসেন খোকন

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্য
জন্ম – ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২২
মৃত্যু — ২৭ ডিসেম্বর ১৯৯২

লিয়াকত হোসেন খোকন

আধুনিক বাংলা গান, নজরুলগীতি আর শ্যামাসংগীতের বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয় ১৯৯২ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর।
আর তাঁর জন্ম ১৯২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।

ধনঞ্জয়ের গাওয়া – ঝির ঝির ঝির বরষা; ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়; জনম মরণ পা ফেলা তোর; বাসরের দীপ আর আকাশের তারাগুলি; হে প্রিয় ফিরাবে কি শূন্য হাতে; মাটির এই খেলাঘরে প্রভৃতি গান কোনোদিন পুরোনো হওয়ার নয়। এমন কালজয়ী গানের সূত্রে বাংলা গানের ইতিহাসে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য পেয়ে গেছেন স্থায়ী আসন।

১৯৪২ সালে ‘জীবনসঙ্গিনী’ ছবি থেকেই তাঁর প্লেব্যাক শুরু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০। এরপরে অসংখ্য ছবিতে গান করে ধনঞ্জয় বাংলা গানে এক নতুন ধারা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জীবন কাটে কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পাড়ায়। এখানেই তিনি মানুষ হয়েছেন। জন্ম ১৯২২ সালে। ১৯৪০ সাল থেকে কলেজ স্ট্রিটে নিজ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই থেকেছেন তিনি। শেষ বয়সে প্রতিদিন সকাল-বিকাল ইউনিভার্সিটি চত্বর, কলেজ স্কোয়ার, মেডিক্যাল কলেজের উলটো ফুটপাতে ঘুরে বেড়াতেন।

কখনো-বা ঘরে বসে যেটুকু গান করতেন, তা ঠাকুরের সেবায় নয়তো ছাত্রছাত্রীদের তালিম দিতে। শোবার ঘরটি ছিল মা কালী, শিব, দুর্গা, কৃষ্ণ, পরমহংসদেব, সারদামণি, স্বামীজি এবং সাধনের প্রতিকৃতিতে আচ্ছন্ন। গান ছিল তাঁর বড়োই প্রিয়। গালে পান আর মুখে হাসি দিয়ে শেষ বয়সেও গাইতেন – ‘যদি ভুলে যাও মোরে’ কিংবা ‘ভুলিতে দিব না আমারে’।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গান গাইতে শুরু করেন ১৯৩২ সাল থেকে, তখন তাঁর বয়স বছর দশেক। তখন তিনি খেয়াল শিখতেন। শিক্ষাগুরু ছিলেন সত্যেন ঘোষাল। বেতারে প্রথম গান গাওয়া শুরু করেন ১৯৩৮ সাল থেকে। প্রথম গান হলো – ‘জোছনা রাতে ডাকে বাঁশি…’।

১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে প্রথম রেকর্ডে গাইলেন – ‘যদি ভুলে যাও মোরে, জানাব না অভিমান’। এই গানটি তখন বেশ পপুলার হলো। ‘যদি ভুলে যাও মোরে’ গান দিয়ে শুরু করে ৫২ বছর ধরে তিনি গান গেয়েছেন। ধনঞ্জয়ের গাওয়া ডিস্ক রেকর্ডের সংখ্যা ৫০০। এর মধ্যে আধুনিক, নজরুলগীতি ও শ্যামাসংগীত রয়েছে।

১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পাবলিক ফাংশনে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য দাপটের সঙ্গে গান গেয়েছেন। তাঁর গান শোনার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসত। ধনঞ্জয় ছোটোবেলা থেকে আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কৃষ্ণচন্দ্র দে, শচীন দেব বর্মণ প্রমুখের গানে অনুপ্রাণিত হয়ে বড়ো কণ্ঠশিল্পী হতে চেষ্টা করেন। প্রথমদিকে বিভিন্ন পাবলিক ফাংশনে তিনি এঁদেরই গান গাইতেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রায় ১০০ ছবিতে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। কোনো কোনো ছবিতে একাধিক গান গেয়েছেন। যেমন – ‘সাধক রামপ্রসাদ’ ছবিতে তিনি ২৩টি গান করেছেন। ‘মাতৃভক্ত রামপ্রসাদে’ তাঁর ১২টি গান ছিল।

চল্লিশের দশকের শুরুতে ‘শহর থেকে দূরে’ ছবিতে নায়িকা মলিনা দেবী ব্রিজের উপর থেকে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাউলের চড়া গলায় –
‘রাধে ভুল করে তুই চিনিলি না
তোর প্রেমের শ্যাম রাই
ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়…’।
এই গানটি গেয়েই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ছায়াছবির জগতে সর্বপ্রথম নাম করেন। ফিল্মের গানে এখান থেকেই তাঁর যথার্থ উত্থান ঘটে। ‘মহাপ্রস্থানের কালে’তে নেপথ্য গায়ক হিসেবে বেশ নাম করলেন তিনি। কানন দেবী অভিনীত – ‘মেজদিদি’ ছবিতে শ্মশানের গান ‘জনম মরণ পা ফেলা তোর’ গানখানি তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলল ১৯৪৯ সালে। ছবিতে নেপথ্যে শুধু কণ্ঠ দেননি তিনি, ‘পাশের বাড়ি’ ছবিতে নায়কের বন্ধুর ক্যারেক্টারে তিনি অভিনয় করেন। এই ছবিতে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘রূপ সায়রের বুকে আলোর ছায়া দোলে’ গানখানি এখনো পথ চলতে গেলে শোনা যায়।

ধনঞ্জয় প্রথম গান করেন ‘আলেয়া’ ছবিতে। ‘বাবলা’য় ‘জীবনমরণ দুটি এসে’ এবং ‘পাশের বাড়ি’তে ‘ঝির ঝির বরষা’ ভিন্ন ধরনের গান দু-খানি ধনঞ্জয় উপহার দিয়েছিলেন। সেই কত বছর আগের এই গান এখনো নতুন মনে হয়। ধনঞ্জয়কে এত বড়ো শিল্পী হতে যাঁর অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তিনি হলেন তাঁরই মা। ১৯৫৯ সালে ধনঞ্জয়ের মা মারা যান। ধনঞ্জয়ের মা চাইতেন, ধনঞ্জয় এবং পান্নালাল সংগীতশিল্পী হোক।

অসম্ভব সুরেলা, সরল-সাবলীল গলা ধনঞ্জয় ও পান্নালালকে খ্যাতনামা গায়ক করে তুলেছিল। পান্নালাল মাত্র সাত বছরের ছোটো ছিল ধনঞ্জয়ের। পান্নালাল অল্প বয়সেই আত্মহত্যা করেন। ছোটো ভাইয়ের মৃত্যুতে সেদিন ধনঞ্জয় ভেঙে পড়েছিলেন। শেষ বয়সে হারালেন স্ত্রীকে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও ঘরে বসে ধনঞ্জয় যে-সব গান গেয়েছিলেন তা স্ত্রীর স্মরণেই গেয়েছিলেন।

বাংলা গানে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সাফল্য

বাংলা গানে একটি বিশেষ স্টাইলের অধিকারী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। গোকুল নাগ, সত্যেন ঘোষালের মতো গুণী রাগসংগীত শিল্পীর কাছে শিক্ষা নিয়ে পরিণত এবং গলার মুড়কির কাজে পরিশীলিত দক্ষতা, পোক্ত লয় এবং গায়কির একাত্মতা মিলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব স্টাইল। রেমিংটন কোম্পানিতে টাইপ শেখার ফাঁকে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ওরিয়েন্টাল মিউজিক ভ্যারাইটিজ কোম্পানিতে।

১৯৪০ সালে সুবল দাশগুপ্তের সুরে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের প্রথম গানের রেকর্ড – ‘যদি ভুলে যাও মোরে, জানাব না অভিমান’ ঘোষণা রেখেছিল একজন দক্ষ শিল্পীর আগমনি। কিন্তু হিন্দুস্থান কোম্পানির অডিশনে ধনঞ্জয়কে অ্যাপ্রুভ করেননি কুন্দনলাল সায়গল এবং কমল দাশগুপ্ত।

তবে পরে ওই একই লেবেল থেকে পাশাপাশি বেরিয়েছে ধনঞ্জয় এবং সায়গলের একের পর এক হিট গান। ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিলেছে’, ‘বাসরের দীপ আর আকাশের তারাগুলি’, ‘হে প্রিয় ফিরাবে কি শূন্যহাতে’, ‘শিল্পীমনের বেদনা’ এমন কালজয়ী গানের সূত্রে বাংলা গানের ইতিহাসে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য পেয়ে গেছেন স্থায়ী আসন। অনিবার্যভাবেই সিনেমার গানে ধনঞ্জয়ের ডাক পড়েছে, তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশের ঠিক পরেই। ১৯৪২ সালে মুক্তি পাওয়া ভারতলক্ষ্মী পিকচার্সের ‘জীবনসঙ্গিনী’ ছবিতে প্লেব্যাক গাইয়ে হিসেবে ধনঞ্জয়ের আত্মপ্রকাশ। তখন তাঁর বয়স কুড়ি। কমবয়সে, শচীন দেব বর্মণ ছিলেন ধনঞ্জয়ের আইডল। জীবনের প্রথম প্লেব্যাক করার সুযোগ পেলেন সেই শচীনকর্তার সঙ্গেই।

হিমাংশু দত্তের সুরে, ‘জীবনসঙ্গিনী’ ছবির টাইটেল সংটি গেয়েছিলেন শচীন দেব বর্মণ, সুপ্রভা সরকার এবং ধনঞ্জয় তিনজনে মিলে। ধনঞ্জয়ের এককভাবে প্লেব্যাক এই হিমাংশু দত্তের সুরেই ‘পাপের পথে’ ছবিতে। তবে তার আগেই মুক্তি পেয়ে গিয়েছে ‘আলেয়া’ এবং ‘মাটির এই খেলাঘরে’ গেয়ে ধনঞ্জয় পেয়ে গিয়েছেন স্বীকৃতি। ১৯৪৩ সালে সুবল দাশগুপ্তের সুরেই ‘শহর থেকে দূরে’ ছবিতে ধনঞ্জয় পেয়ে গেলেন পরবর্তী সাফল্যের আরেক ধাপ।

প্লেব্যাক চালু হয়ে গেলেও, তখনো গাইয়েকে দিয়ে অভিনয় করানোর ঘোর কাটেনি সিনেমার, ফলে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকেও সেই পথে পা দিতে হলো। সুবীর মুখার্জি পরিচালিত ‘পাশের বাড়ি’ ছবিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন ধনঞ্জয়। অভিনয়ে, চলাফেরায় জড়তা কাটিয়ে উঠতে না পারলেও, গানের সূত্রে পেয়ে গেলেন দারুণ জনপ্রিয়তা।

‘পাশের বাড়ি’ ছবিতে সলিল চৌধুরীর সুরে ‘ঝির ঝির ঝির বরষা’ ধনঞ্জয়ের একটি সুপারহিট চিত্রগীতি হয়ে আছে। এরপর, অভিনয়ের ডাক পেলেন বাংলা ছবির সম্রাজ্ঞী কানন দেবীর কাছে থেকে, যা এড়াবার প্রশ্নই ওঠে না, উপরন্তু শরৎচন্দ্রের কাহিনি, মানে প্রিয় লেখকের গল্প। অতএব ‘নববিধান’ ছবিতে কানন দেবীর ভাইয়ের ভূমিকায়, সেইসঙ্গে যৌথভাবে এবং একক কণ্ঠে গাইতে হলো গান।

‘অদৃশ্য মানুষ’ ছবিতে জহর রায়ের সঙ্গে একটি কমিক চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন ধনঞ্জয়, গেয়েছিলেন সত্য চৌধুরীর সুরে ‘আরও একটুখানি ছবি’। এরপর ধনঞ্জয় ভট্টাচর্যের ওপর চোখ পড়ে বাংলার মুভি মোগল বি এন সরকারের এবং তিনি সরাসরি নায়ক বানিয়ে দেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে, ‘লেডিস সিট’ ছবিতে। উপরন্তু এ ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে। এরপর আরেকটি ছবিতেই অভিনয় করেছিলেন ধনঞ্জয়, ‘শ্বশুরবাড়ি’। ইতোমধ্যেই তিনি বুঝে নিতে পেরেছিলেন সেলুলয়েড নয়, তাঁর নিজস্ব মাধ্যম শুধুই মাইক্রোফোন। ফলে এরপর ‘ঢুলি’ ছবিতে নায়কের চরিত্র এবং ‘কবি’ ছবির নামভূমিকায় অভিনয়ের লোভনীয় অফার তিনি নির্দ্বিধায় ছেড়ে দিতে পেরেছেন।

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ছবির অন্যতম প্রধান প্লেব্যাক গাইয়ে। এরপর আবির্ভাব হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এবং দুজনেই ছিলেন সিনেমার গানে পুরুষকণ্ঠ হিসেবে প্রধান আকর্ষণ। একের পর এক অসাধারণ জনপ্রিয় গান, সিনেমার জন্য গেয়েছেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। ‘ঢুলি’ ছবিতে ‘ত্রিনয়নী দুর্গা মা তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে’ বা ‘ভাঙনের তীরে ঘর বেঁধে কিবা ফল’; ‘বাবলা’ ছবির ‘জীবন পারাবারের মাঝি’, ‘নবজন্ম’ ছবির ‘আমার সমাধি পরে’, ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ ছবির ‘মাধব বহুত মিনতি করে তোর’, ‘স্বামীজি’ ছবির ‘মন চল নিজ নিকেতনে’, ‘পাশের বাড়ি’ ছবির ‘রূপসায়রের বুকে’, ‘নয়নে তারি ভোমরা কাজল’ এমন বহু চিত্রগীতি স্মরণীয় হয়ে আছে ধনঞ্জয়ের কণ্ঠে।

অনুপম ঘটকের সেই বিখ্যাত গানবহুল ছবি ‘একতারা’য় ধনঞ্জয়ের গাওয়া ‘কেন পত্র ব্যথা বাজে’ একটি অসাধারণ কম্পোজিশন, ওই ছবিতেই ধনঞ্জয়ের আরেকটি গানও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল – ‘আমি গড়ি ত্রিগুণা রাধা’।

রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘বাবলা’ ছাড়াও ‘শিল্পী’ ছবির ‘বন্ধুরে তুমি বিহনে’, ‘ফল্গু’ ছবির ‘চারদিনের এই মেলা’, ‘চন্দ্রনাথ’ ছবির ‘স্মৃতির বাঁশরি’ ধনঞ্জয়ের খুবই উল্লেখযোগ্য গান। রবীনের সুরে ‘মহানিশা’, ‘মামলার ফল’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘বিপাশা’ এমন আরও ছবিতে গেয়েছেন ধনঞ্জয়। রাগাশ্রয়ী গানে ধনঞ্জয়ের স্বাভাবিক দক্ষতাই ছিল, কিন্তু ‘গোবিন্দদাস’ ছবির ‘ও মোর চাঁদবদনী’, ‘বড়োদিদি’ ছবির ‘ও দয়াল গো’, ‘বিপ্লবী ক্ষুদিরাম’ ছবির ‘একবার বিদায় দাও মা’ এমন লোকসুরাশ্রিত বহু গানেই মুনশিয়ানার পরিচয় রেখেছেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। আর ভক্তিসংগীতকে তো নিজস্ব ক্ষেত্র করে তুলেছিলেন ধনঞ্জয়। সে ‘আদ্যাশক্তি মহামায়া’ ছবির ‘পরখ যদি নিতে হয় মা’, বা ‘রানি রাসমণি’ ছবির ‘গয়াগঙ্গা প্রভাসাদি’ যাই হোক ধনঞ্জয়ের দরদি কণ্ঠ সে গানে যোগ করেছে অতিরিক্ত মাত্রা। ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘শ্রীবৎসচিন্তা’, ‘সতী অহল্যা’, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ থেকে ‘রূপ সনাতন’, ‘শচীমার সংসার’ বা একাত্তর সালের ‘ত্রিনয়নী মা’ পর্যন্ত বহু ধর্মমূলক ছবির প্রায় কুড়িটি গান একাই গাইতে হয়েছে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে।

‘মহাপ্রস্থানের পথে’, ‘কথা কও’, ‘কালো বউ’, ‘গোধূলি’, ‘পরাধীন’, ‘হে মহামানব’, ‘মানরক্ষা’, ‘হার-জিৎ’, ‘বাক-সিদ্ধ’, ‘নতুন ফসল’, ‘মন দিল না বঁধু’ – এমন অনেক ছবিতেই ধনঞ্জয়ের প্লেব্যাকের বৈচিত্র্যময় নিদর্শন ছড়ানো রয়েছে।

গানের সুর ধরে রাখতে বা উচ্চারণে, ধনঞ্জয় কণ্ঠের মুনশিয়ানা, কণ্ঠসম্পদের সার্থক প্রয়োগ, সর্বোপরি মগ্ন পরিবেশনা নিয়ে কোনো দ্বন্ধ নেই। আর এসব গুণাবলির পর্যাপ্ত ব্যবহারে আধুনিক বাংলা গান, ভক্তিসংগীতের পাশাপাশি সিনেমার গানেও তিনি হয়ে আছেন একটি বিশিষ্ট ধারার প্রতিনিধি এবং চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়!

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘শহর থেকে দূরে’ ছবিটিতে ধনঞ্জয়ের বিখ্যাত গানের পাশাপাশি আরও দুটি গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল – ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ এবং ‘ও পরদেশি কোকিলা’। গায়িকা ছিলেন ‘কালো আঙুর’ নামে একজন প্লেব্যাক গাইয়ে। আঙুরবালার গায়ের রং ফরসা ছিল বলেই হয়ত, দ্বিতীয় আঙুরকে কালো নাম নিতে হয়েছিল। ওই দুটি গানের মাঝে মাঝে একটি পুরুষকণ্ঠও উঁকি দিয়েছে কয়েকবার, সে কণ্ঠ জটাধর পাইনের। তুলনায় সল্পপরিচিত অথচ এই গুণী শিল্পী – জটাধর পাইন, ‘আমার দেশ’, ‘আশাবরী’, ‘১০৯ ধারা’ এবং ‘সীতার পাতাল প্রবেশ’ ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য গান হলো – অন্তবিহীন এই অন্ধরাতের শেষ ; আমি আঙুল কাটিয়া কলম বানাই ; এইটুকু এই জীবনটাতে ; এই ঝির ঝির ঝির বাতাসে ; এতটুকু আমি কতটুকু পারি দিতে এই পৃথিবীতে ; এমন মধুর ধ্বনি আর শুনিনি তার চরণ নূপুরে ; ও তুই মেঘের ঘোরে থাকবি কত আর ; চামেলি মেলো না আঁখি ; ঝনক ঝনক বাজে ; ঝির ঝির ঝির ঝিরঝির বরষায় ; ত্রিনয়নী দুর্গা, মা তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে ; বাসরের দীপ আর আকাশের তারাগুলি ; ভাঙনের তীরে ঘর বেঁধে কী বা ফল ; মাটিতে জন্ম নিলাম মাটি তাই রক্তে মিশেছে ; যদি ভুলে যাও মোরে জানাব না অভিমান ; রঙ্গিলা রঙ্গিলা মন নিলা রে ; রাধে ভুল করে তুই চিনলি না তোর প্রেমের শ্যামরায় ; শিল্পী মনের বেদনা নিঙাড়ি যে গান রচিনু হায় , মনব্যথা কাহারে জানাই – ইত্যাদি – ইত্যাদি।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গান ঃ
১.
এসো এসো তোমায় গান শোনাই
এ গানে ঘুমের দেশে ফুল পরিদের
স্বপন জরির জাল বোনাই।
মায়াবী চাঁদের আলো অঝোর ধারে
ভালোবাসার মায়ায় ভরে
সবার মনের সব কোনাই।
এ গানের কেয়াবনে সজল হাওয়া
পাতায় মিতালি গো
এ গানে দেয় যে ধরা
সোনার মায়ামৃগ
এ গানে যে তোলে তার মনের কোলে
পুরান স্মৃতি আবার জাগবে বলে
হঠাৎ জাগা পাখি ডাকে
চমক ভাঙা দিন গোনাই।

২.
নয়নে তার ভোমরা কাজল কালো
দুই কানে তার ঝুমকো লতা দোলে
কালো কেশে সর্বনাশের নেশা
চলন দেখা পলকে মন ভোলে ভোলে গো
পরশ লোভী শরম রাঙা ঠোঁটে
ললাটে তারি চন্দনের টিকা
পূর্ণিমার চাঁদ যেন মেঘের কোলে
হাসলে পরে মুক্তা মানিক ঝরে ঝরে
কান্নাতে তার সাত সাগরের ঢেউ
মদির চোখে তাকালে মন হরে
পথের সাথি হয়নি আজও বুঝি কেউ।

৩.
ঝির ঝির ঝির ঝিরঝিরি বরষায় –
হায় কি গো ভরসা আমার ভাঙা ঘরে তুমি বিনে।
শন শন শন শন বহে হাওয়া
মিছে গান গাওয়া এমন দিনে।
এল রে ঝড় এল এল,
জীবনের ঢেউ এলোমেলো
বাহিরের দ্বার খুলে গেল –
তবু একা বসে থাকা কাল গুনে।
তুমি কোথা কত দূরে কও কথা দাও সাড়া,
কবে গো তোমারই সুরে আমার এ গান হবে সারা।
জীবনে যায় বয়ে বেলা,
সহে না আর অবহেলা,
এবার শেষ করো খেলা –
মনে মনে এসো ওগো পথ চিনে।
৪.
রাধে !
ভুল করে তুই
চিনলি না তোর প্রেমের শ্যামরায়
(কেন) ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়।
তোর চোখের জলের বেসাত ঢালি
নদীর জলে জল মেশালি,
কেন ঘর বেঁধে ঘর ভাঙতে গেলি অভিমানের ঘায়।
(কেন) চাঁদের আলো দেখতে গিয়ে
আঁচল দিয়ে ঢাকলি আঁখি,
চাঁদের কী দোষ আপন ভুলে
আপনারে তুই দিলি ফাঁকি।
(তুই) ফুল কুড়াতে ভুল কুড়ালি,
কাঁটার বুকে হাত বাড়ালি –
(কেন) জলভরা ওই মেঘের বুক
বজ্র দেখিস হায় !
ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়… …
(‘শহর থেকে দূরে’ ছবির গান — ১৯৪৩)

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD