বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩১ পূর্বাহ্ন

স্মৃতিময় হাতিয়া ভ্রমণ -মোহাম্মদ শামীম মিয়া

স্মৃতিময় হাতিয়া ভ্রমণ -মোহাম্মদ শামীম মিয়া

স্মৃতিময় হাতিয়া ভ্রমন
✑ মোহাম্মদ শামীম মিয়া

নোয়াখালী জেলার হাতিয়া একটি মনোমুগ্ধকর জায়গা,যেকারোই মন ভরে যাবে এখানে এলে। সময় করে একবার হলেও এখানে আসা দরকার। গত ২১ এপ্রিল সকালে আজমিরী বাসে গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে ঢাকা শহরের দিকে রওনা দিলাম, রমজান মাসের শেষ জুম্মা ছিলো ঐদিন তাই গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে বাস থেকে নেমে গেলাম। সোজা হেঁটে গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় বায়তুল মুকাররম জামে মসজিদে জুম্মা নামাজ আদায় করে নিলাম। সকলের জন্য দোয়া করেছি ঐদিন নামাজ আদায় করে, তারপর গোলাপ শাহ মাজারের কাছ থেকে সদরঘাটের বাসে উঠে পড়লাম। লঞ্চ ছাড়তে ছাড়তে বিকাল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেলো। এর আগে অনেক সময় পেয়েছিলাম তখন ছোট নৌকায় করে বুড়িগঙ্গা নদীটা এপারওপার ঘুরে ফিরে দেখে আসলাম। রোজার সময় তাই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পাশের দোকান থেকে ইফতার,পানি সহ আরো অনেক কিছু কিনে নিলাম। এম ভি ফারহান-০৩ লঞ্চটি হাতিয়ার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করার ঠিক বিশ মিনিটের মধ্যেই নদীতে ঝড়ের কবলে পড়লো, লঞ্চ চালক দ্রুত বুদ্ধিমত্তায় তীরের একপাশে ভিড়লেন। কিছু যাত্রী ভয়ে নেমে গেলেন, কিছু সময়ের মধ্যে ঝড় থেমে গেলো আবারও গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা। রাতের আঁধারে মেঘনা নদীর বুক ছিঁড়ে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী নিয়ে এম ভি ফারহান-০৩ লঞ্চটি ছুটে চললো। আমাদের দ্বিতীয় তলায় কেবিন ভাড়া করা ছিলো, কিন্তু আমাকে নতুন অভিজ্ঞতার নেশায় পেয়ে বসলো।কেবিনে না ঘুমিয়ে সারারাত জেগে জেগে নদীর বুকের বড় বড় ঢেউ,গভীর নদীতে জেলেদের মাছ ধরার সাহসিক দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলাম। আমাদের লঞ্চটি সদরঘাট থেকে প্রথমে বরিশালের কালীগঞ্জে গিয়ে ভেড়ালো,এরপর ভোলার ইলিশাঘাট,
দৌলতখান,হাকিমুদ্দিন,তজমুদ্দি(মির্জাকালু),মনপুরা(রামনেওয়াজ) এবং সবশেষে সকালবেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ঘাটে এসে পৌঁছালো। তমরদ্দি ঘাট থেকে সি এন জি করে জীবনের প্রথম পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের হাতিয়ার উছখালী বাজার।এই ঈদের সময় হাতিয়া যাওয়ার মূল কারণ হলো আমি বিয়ে করেছি দুহাজার আট সালে মানে প্রায় পনেরো বছর!এইসময়ে আমার ছেলে ও মেয়ে বড় হয়ে গেছে, বুড়ো বয়সে নতুন জামাই সাজা!ওখানে আগে আগেই চলে গিয়েছিলো আমার স্ত্রী
ও মেঝো ছেলে রাহাত। যাওয়া সময় আমার সাথে
ছিলো বড় ছেলে সায়মন ও ছোট মেয়ে নাজিফা। শ্বশুর, শ্বাশুড়ি,শালা,শালিকার স্বামী সহ আরো অনেকে।জীবনের প্রথম নতুন পরিবেশ, নতুন জায়গা অন্যরকম অনুভূতি লাগছিলো। হাতিয়ার উছখালী বাজার তমরদ্দি রোডের পাশে হাতিয়া ইলেকট্রনিক্সের মালিক চাচা শ্বশুর নাহিদ কাকার বাসায় গিয়ে উঠলাম,
সারারাত না ঘুমিয়ে ওখানে গিয়েছিলাম, সকাল সাড়ে আটটায় ঈদের নামাজ, তাই অনন্ত ঘন্টা দেড়েক ঘুমিয়ে নিলাম।ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি গোসল করে
ওখানকার বাজারের পাশে এক জামে মসজিদে সকলের সাথে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করলাম। ঈদের নামাজ শেষে আমার শ্বশুর বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে সকলের জন্য দোয়া করলাম,এরপর বাসায় ফিরে সেমাই রুটি সহ আরও অনেক খাবার খেয়ে আবারও ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দুপুর হয়ে গেলো! পুরো হাতিয়ার উছখালী বাজারটা চক্কর দিলাম,ছবি ও ভিডিও করলাম। ঈদের দিন সন্ধ্যায় শ্বশুর বাড়ির আপনজন সকলের বাসায় নেমন্তন্ন ছিলো,বুড়ো বয়সে এই প্রথম জামাই হিসাবে অনেক আদর ও সেলামী পেলাম! চাচা শ্বশুর, চাচী শ্বাশুড়ি, দাদা,দাদী,নানা,নানী ফুপু, ফুপা শ্বশুর সহ সকলের বাসায় গিয়েছি, ঈদের দিন থেকে টানা তিনদিন নেমন্তন্ন আর নেমন্তন্ন!এইবার ঈদের সময় হাতিয়ার উছখালী বাজার যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিলো চাচা শ্বশুর নাহিদ কাকার একমাত্র মেয়ে টুম্পার বিয়ে, যদিও এর আগে বিয়ের সমস্ত আয়োজন ঢাকায় হয়েছে। তারপরও নিকট আত্মীয় স্বজনের নিয়ে ওখানে বিয়ের অন্যরকম আয়োজন,আমেজ উপভোগ
করলাম। হাতিয়া মূলত মেঘনা নদী বেষ্টিত একটা স্বপ্নের দ্বীপ,চারদিকে পানি আর পানি, সবুজের
সমারোহ,মন প্রাণ ভরে উঠে। যেদিকে তাকাই শুধু সুন্দর আর সুন্দর, সবুজ ও সতেজ প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখা। ওখানে সবখানেই সুন্দর সুন্দর স্পট, সতেজ নির্মল বাতাস,পাখির কিচিরমিচির, কোথাও ধুঁধুুঁ বালুর মাঠ, রোদ ও বৃষ্টির খেলা। একুশ থেকে সাতাইশ এপ্রিল সাতদিন ছিলাম ওখানে, দেখে এলাম কাজির বাজার কমলা দীঘি পর্যটন কেন্দ্র,খুবই সুন্দর একটা জায়গা, মেঘনা নদীর বুক ছিঁড়ে সুন্দর স্পট, ঢেউ এসে প্রতিনিয়ত পায়ের কাছে খেলা করে। চারদিকে ঝাউবন হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনা মন আকৃষ্ট করে।
অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল স্বপ্নের দ্বীপ হাতিয়ায় এলে দেখবো নিঝুম দ্বীপ! এইবার সত্যি ই দুচোখ ভরে দেখে এলাম। গত মঙ্গলবার তমরদ্দি রোডের হাতিয়া প্রাইভেট হাসপাতালের মোড় থেকে অটোরিকশা করে গেলাম হাতিয়া বাজার। ওখান থেকে সি এন জি করে ছুটে গেলাম জাহাজ মারা বাজার, তারপর হোন্ডা করে পাকা রাস্তা আবার খালি মেঠোপথ ধরে মোক্তারঘাট। ওখান থেকে ট্রলারে করে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলাম আরেক ঘাটে। সেই ঘাট থেকে আবারও সি এন জি করে ছুটে গেলাম নামা বাজার। মূলত নামা বাজারই নিঝুম দ্বীপের প্রাণ কেন্দ্র,এখানে থাকা ও খাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা আছে। আমি ওখানে থাকি নাই। সময়ের অভাবে দিনে গিয়ে দিনেই চলে এসেছি। আমি বেচু মিয়া নামের একজন হোন্ডা চালকে ভাড়া নিলাম, বেচু ভাই ওয়াচ টাওয়ার, ফরেস্ট হাউস, বয়ে চলা জোয়ার ভাটার খাল, জেলেদের মাছ ধরা, নৌকা তৈরি, বাঁশের সাঁকো, সবুজ বন, সি বিচ পয়েন্ট এবং মরুভূমির মতো উত্তপ্ত বালুর মাঠ সহ আরো অনেক কিছুই দেখালেন।দুঃখের বিষয় সময় কম থাকায় হরিণ দেখা হলো না!এইভাবে সন্ধ্যার আগেই স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপ দেখে ফিরে আসি হাতিয়ার উছখালী বাজার।ইচ্ছে ছিলো ওখানে আরও কয়েকদিন থাকার,কিন্তু সময়ের অভাবে থাকা হয়নি। গিয়েছিলাম এক পথে আসার সময় নতুন অভিজ্ঞতার জন্য অন্য পথে আসলাম। বৃহস্পতিবার আবারও তমরদ্দি রোড থেকে হাতিয়ার উছখালী বাজার এসে সি এন জি করে ছুটে এলাম নলচিরা ঘাট। নলচিরা মহিষের দুধ ও দধি পাওয়া যায়,খুবই সুস্বাদু খাবার খেয়ে নিলাম পেটপুরে। এখানে ট্রলার, সি-ট্রাক ও স্পিড বোট ছিলো,অনেকেই স্পিট বোটে যাতায়াত করে থাকেন, যদিও ভাড়া একটু বেশি। আমিও স্পিট
বোটে করে মাত্র পঁচিশ মিনিটে প্রায় সতেরো কিঃমিঃ সাগর সমান মেঘনা নদী পাড়ি দিলাম,ভাড়া নিলো পাঁচশো টাকা। নদী পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাট,ওখান থেকে সি এন জি করে সোনাপুর। উপকূল পরিবহনে করে সোনাপুর থেকে কুমিল্লার বিশ্বরোড হয়ে রয়েল পরিবহনে করে নিজ জন্মস্থান সুহিলপুর (মৌলভীবাড়ি) ব্রাহ্মণবাড়িয়া। প্রথমে তো যেতেই চাচ্ছিলাম না,তবে রূপ দেখে ওখানকার প্রেমে পড়ে গেলাম, আসার পথে দ্বীপ হাতিয়ার জন্য অনেক অনেক মায়া লাগছিলো।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD