মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন

সাহসী দার্শনিক – আহমেদ জহুর

সাহসী দার্শনিক – আহমেদ জহুর

সাহসী দার্শনিক - আহমেদ জহুর

সাহসী দার্শনিক : আহমেদ জহুর

সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুকে অনেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হলে ক্রিটো তাঁকে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সক্রেটিস এ পরামর্শ প্রত্যাখান করে মৃত্যুকেই বরণ করে নিয়েছিলেন।

আজ বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের জন্মদিন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০-এ গ্রিসের এথেন্স নগরীতে এক এলোপাকি গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্লেটোর বর্ণনামতে, সক্রেটিসের বাবার নাম সফ্রোনিস্কাস এবং মায়ের নাম ফিনারিটি, যিনি একজন ধাত্রী ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম জানথিপি, যার বয়স ছিল সক্রেটিসের থেকে অনেক কম। সংসার জীবনে তাদের তিন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, যাদের নাম ছিল লামপ্রোক্লিস, সফ্রোনিস্কাস এবং মেনেজেনাস।

প্রাচীন এই মহান গ্রিক দার্শনিকের সম্পর্কে তথ্য লিখিতভাবে পাওয়া যায় কেবলমাত্র তাঁর শিষ্য প্লেটো-র ডায়ালগ এবং সৈনিক জেনোফন এর রচনা থেকে। তৎকালীন শাসকদের কোপানলে পড়ে তাঁকে হেমলক বিষ পানে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তাঁকে পশ্চিমা দর্শনের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি এমন এক অনন্য দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছেন, যা দীর্ঘ ২৪০০ বছর ধরে পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। সক্রেটিস ছিলেন এক মহান শিক্ষক, যিনি কেবল শিষ্য গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর কোন নির্দিষ্ট শিক্ষায়তন ছিল না। যেখানেই যাকে পেতেন তাকেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝানোর চেষ্টা করতেন।

কর্মজীবন….
সক্রেটিস তাঁর বাবার পেশা অবলম্বন করেছিলেন। বাবা ছিলেন একজন ভাস্কর। সে হিসেবে তাঁর প্রথম জীবন কেটেছে ভাস্করের কাজ করে। প্রাচীনকালে অনেকেই মনে করতেন গ্রিসের অ্যাক্রোপলিসে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিরাজমান ঈশ্বরের করুণা চিহ্নিতকারী মূর্তিগুলো তাঁরই হাতে তৈরি। অবশ্য জেনোফোনের সিম্পোজিয়ামে সক্রেটিসকে বলতে শোনা যায়, তিনি কখনও কোন পেশা অবলম্বন করবেন না, কারণ তিনি ঠিক তা-ই করবেন, যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আর তা হচ্ছে দর্শন নিয়ে আলোচনা।


অর্থাৎ তিনি দর্শন নিয়ে শিক্ষকতা করাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে প্লেটোর ডায়ালগুলোর বিভিন্ন স্থানে লেখা হয়েছে যে সক্রেটিস কোন এক সময় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।

ব্যক্তিত্ব, দাম্পত্য….
সক্রেটিস দেখতে সুদর্শন ছিলেন না। টাকবিশিষ্ট মাথা, চ্যাপ্টা অবনত নাক, ছোট ছোট চোখ, স্ফীত উদর এবং অস্বাভাবিক গতিভঙ্গির সমন্বয়ে গঠিত ছিল তাঁর সামগ্রিক চেহারা। দেহের শ্রী তেমন না থাকলেও তাঁর রসবোধ ছিল প্রখর এবং কথাবার্তা ও আচার-আচরণে তিনি ছিলেন মধুর ব্যক্তি। তাই যে-ই তাঁর সাথে কথা বলতো সে-ই তাঁর কথাবার্তা ও চরিত্রসৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যেতো।

অধিকাংশের বর্ণনামতে, তিনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা প্রদান করতেন না। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজারই ছিল তাঁর শিক্ষায়তন। দর্শন অনুশীলন করতে যেয়ে সংসার ও জীবিকা সম্পর্কে খুবই উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য শেষ জীবনে তাঁর পুরো পরিবারকে চরম দারিদ্র্য ও অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়। বেশিরভাগ সময়ে তিনি তাঁর শিষ্যদের বাড়িতে পানাহার করতেন। স্ত্রী জানথিপির কাছে তিনি ছিলেন অবজ্ঞার পাত্র। জানথিপি প্রায়ই বলতেন, তার নিষ্কর্মা স্বামী পরিবারের জন্য সৌভাগ্য না এনে দুঃখ-কষ্টই এনেছেন বেশি।

বিচার, মৃত্যু….
এথেনীয় সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার যুগ থেকে পেলোপনেশীয় যুদ্ধে স্পার্টা ও তার মিত্রবাহিনীর কাছে হেরে যাওয়া পর্যন্ত পুরো সময়টাই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পরাজয়ের গ্লানি ভুলে এথেন্স যখন পুনরায় স্থিত হওয়ার চেষ্টা করে তখনই স্থানীয় জনগণ একটি কর্মক্ষম সরকার পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রের সঠিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করে। সক্রেটিসও তখন শাসকের সমালোচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাই অনেকে সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হলে ক্রিটো তাঁকে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সক্রেটিস এ পরামর্শ প্রত্যাখান করে মৃত্যুকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯-এ হেমলক বিষ পান করানোর মাধ্যমেই তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।


মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বলা শেষ বাক্য ছিল: “ক্রিটো, অ্যাসক্লেপিয়াস আমাদের কাছে একটি মোরগ পায়, তাঁর ঋণ পরিশোধ করতে ভুলো না যেন।” অ্যাসক্লেপিয়াস হচ্ছে গ্রিকদের আরোগ্য লাভের দেবতা। সক্রেটিসের শেষ কথা থেকে বোঝা যায়, তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন মৃত্যু হল আরোগ্য এবং দেহ থেকে আত্মার মুক্তি। রোমান দার্শনিক সেনেকা তাঁর মৃত্যুর সময় সক্রেটিসের নকল করার চেষ্টা করেছিলেন। সেনেকাও সম্রাট নিরোর আদেশে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

দার্শনিক পদ্ধতি….
সক্রেটিস দার্শনিক জেনোর মত দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই পদ্ধতিতে প্রথমে প্রতিপক্ষের মত স্বীকার করে নেয়া হয়, কিন্তু এর পর যুক্তির মাধ্যমে সেই মতকে খণ্ডন করা হয়। এই পদ্ধতির একটি প্রধান বাহন হলো প্রশ্ন-উত্তর। সক্রেটিস প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেই দার্শনিক আলোচনা চালিয়ে যেতেন।

প্রথমে প্রতিপক্ষের জন্য যুক্তির ফাঁদ পাততেন এবং একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকতেন। যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ পরাজিত হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে নেয়, ততক্ষণ প্রশ্ন চলতেই থাকতো। সক্রেটিসের এই পদ্ধতির অপর নাম সক্রেটিসের শ্লেষ (Socratic irony)।

কিছু দার্শনিক উক্তি

◾অপরীক্ষিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা গ্লানিকর।
◾পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের
আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান।
◾পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি-ই ভাল আছে, জ্ঞান।
আর একটি-ই খারাপ আছে, অজ্ঞতা।
◾কাউকে শিক্ষা দেওয়া যায় না, কেবলমাত্র
তাকে চিন্তা করতে সাহায্য করা যায়।
◾বিস্ময় হল জ্ঞানের শুরু।
◾টাকার বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চেয়ে
অশিক্ষিত থাকা ভাল।
◾জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে
প্রশ্ন করে তার কাছ থেকেই উত্তর জেনে
দেখানো যে, জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।
◾বন্ধু হচ্ছে দুটি হৃদয়ের একটি অভিন্ন মন।
◾প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যে, অন্যকিছু
জানার মধ্যে নয়।
◾তুমি কিছুই জানো না, এটা জানা-ই জ্ঞানের
আসল মানে।
◾তোমার স্ত্রী ভাল হলে তুমি হবে সুখী, আর
খারাপ হলে হবে দার্শনিক।
◾সেই সাহসী যে পালিয়ে না গিয়ে তার দায়িত্বে
থাকে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
◾সুখ্যাতি অর্জনের উপায় হল তুমি কী হিসেবে
আবির্ভূত হতে চাও তার উপক্রম হওয়া।
◾শক্তমন আলোচনা করে ধারণা নিয়ে, ঘটনা
নিয়ে আলোচনা করে গড়পড়তা মন, আর
দুর্বল মন আলোচনা করে মানুষ নিয়ে।
◾ নিজেকে জানো।
◾মৃত্যুই হল মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় আশীর্বাদ।

© আহমেদ জহুর
কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
azohur2002@gmail.com

#তথ্যসূত্র

০১। The ancient tradition is attested in
Pausanias, 1.22.8; for a modern
denial, see Kleine Pauly, “Sokrates” 7;
the tradition is a confusion with the
sculptor, Socrates of Thebes,
mentioned in Pausanias 9.25.3,
a contemporary of Pindar.
০২। সক্রেটিস : প্রাচীন ও মধ্যযুগের পাশ্চাত্য
দর্শন। লেখক- আমিনুল ইসলাম, শিখা
প্রকাশনী। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর, ২০০০।
০৩। Trans. based on Gomme,
Commentary on Thucydides 2.384.
—————————————–

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD