সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২২ অপরাহ্ন

বিবেকানন্দ এবং বাংলাদেশের কট্টর মুসলমান:হাসান ফকরি

বিবেকানন্দ এবং বাংলাদেশের কট্টর মুসলমান:হাসান ফকরি

বিবেকানন্দ

বিবেকানন্দ এবং বাংলাদেশের কট্টর মুসলমান: একটি প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ

স্বামী বিবেকানন্দ সমগ্র ভারতবর্ষে খুবই সম্মানিত মানুষ। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের কাছেও তিনি খুব শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। কিন্তু তার এই সম্মান বা শ্রদ্ধা কীসের জন্য? কখনোই এটা কি মূল্যায়ন করা দেখা হয়েছে যে, তাঁর মহত্ব নিয়ে যে-সব কথাবার্তা হয় তার মূল কারণটা কী। মূলত তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের বা বেদ বেদাঙ্গের পুনরুত্থানবাদীদের দলে। বাংলাদেশের কট্টরপন্থী কিছু মানুষ যেমন চায় কুরান আর সুন্নাহ অনুসরণ করে দেশ চালাতে, নারীর শিক্ষা-কর্মসংস্থান বন্ধ করতে; বিবেকানন্দ তেমনই চেয়ে ছিলেন।

বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয়ভাবে গোঁড়া মুসলমান ইতিহাসকে যেমন পিছনের দিকে টানতে চাইছেন, বিবেকানন্দ ঠিক তাই চাইতেন। বিবেকানন্দ একা নন, বাংলার উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রায় সকল হোতারাই চাইতেন প্রাচীন ভারতে ফিরে যেতে, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বা সনাতন ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করতে। ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হতে পেরেছিলেন খুব কম মানুষ। নবজাগরণের পাণ্ডারা বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে উন্নত করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখলেও তাঁদের প্রায় সকলেই ছিলেন কুসংস্কার আচ্ছন্ন, হিন্দুত্বের প্রর্বতক।

ভারতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ সৃষ্টিতে এঁদের অনেকেরই কমবেশি অবদান ছিল। বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের সেইসব মহারথীরা একদিকে সনাতন হিন্দুধর্মকে ফিরিয়ে আনতে চাইতেন, ভিন্ন দিকে মনে করতেন ভারতে ব্রিটিশ শাসন ঈশ্বরের আশির্বাদ। রামমোহন থেকে বিবেকানন্দ সকলেই এ ব্যাপারে সমগোত্রীয়। খ্যাতিমানদের মধ্যে সেখানে বিশেষভাবেই ব্যতিক্রম ছিলেন মধুসূদন দত্ত। সে যুগে হিন্দু মুসলমান প্রশ্নের ঊর্ধ্বে সবচেয়ে আধুনিক মানুষ ছিলেন তিনি। যিনি না ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। বাংলা ভাষা সাহিত্যকে তিনি সৃজন করে গেছেন ভিন্ন রূপে, যা নিজেই ভিন্ন পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষের তকমা দেয়া হয় যে রামমোহন রায়কে, তিনি কিন্তু ধর্ম বর্জন করেননি। তিনি ভারতের তেত্রিশ কোটি দেবতার জায়গায় একেশ্বরবাদের প্রতিষ্ঠা করেন। সেটাকে কি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষরা খুব প্রগতিশীল চিন্তা বলবেন? ইসলাম ধর্ম তো এই একেশ্বরবাদ-এর চিন্তা নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিল ইহুদি এবং খ্রিস্টধর্মের পরে।

রামমোহন ইংরেজ শাসনের পক্ষে ছিলেন এবং নীলকরদের পক্ষে কাজ করেছেন। সেটা কি তাঁর প্রগতিশীলতা? রামমোহন অবশ্য ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। ধর্ম হিসেবে একেশ্বরবাদ মানলেও, তিনি প্রাচীন ভারতের বৈদিক ধর্মে ফিরতে চাননি, জীবন থেকে আবার ধর্মকে বিসর্জন দিতে চাননি। সকল ধর্ম সম্পর্কে তাঁর সমালোচনাও ছিল। তিনি বিভিন্ন দিক থেকে যথেষ্ট আধুনিক মানুষ ছিলেন।

দ্বারকানাথ ঠাকুরও তাই, তিনি ইংরেজ শাসনকে ভারতের জন্য আশির্বাদ মনে করলেও, সেভাবে ধার্মিক ছিলেন না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি বা ধর্মের প্রচার বা হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলেননি। রাজনারায়ণ বসু, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ বহু রকম আধুনিক কথাবার্তা বললেও শেষ পর্যন্ত সকলেই চূড়ান্ত বিচার বৈদিক ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং সেই ধর্মের প্রচার এবং প্রসারের পক্ষে ছিলেন। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সেই সঙ্গে আধ্যাত্মিক জগত এঁদের প্রায় সকলের কাম্য ছিল।

হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের একজন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা আসলে ধর্ম বিসর্জন না দিয়ে তার কিছু কিছু সংস্কার চেয়েছিলেন। সতীদাহ নিষিদ্ধ করা তার একটি। সকলে ছোঠখাটো সংস্কারের কথা বলার পাশাপাশি বেদ আর বৈদিক ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের মহিমা প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।

মধুসূদন সহ সামান্য কজন মানুষ তার ব্যতিক্রম ছিলেন। বাকিরা ইংরেজদের জ্ঞানবিজ্ঞান বা চিন্তার আলোকে কিছুটা প্রগতিশীল হতে চাইলেও, শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মুক্তমনের মানুষ ছিলেন না। নানারকম স্ববিরোধী চিন্তা আর কর্মের ভিতর দিয়ে সময় পার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিবেকানন্দের সমবয়সী। কিন্তু চিন্তাচেতনায় ছিলেন ভিন্ন ধরনের মানুষ। পারিবারিক পরিবেশের ভিতরে কিশোর রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যথেষ্ট। হিন্দুত্বের পক্ষে দাঁড়িয়ে কঠোর সমালোচনা করেন মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের।

কিশোর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য সেটাই ছিল বাস্তব। পরবর্তীকালে সত্যের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিবর্তন করেছেন বারবার। দুঃখপ্রকাশ করেছেন কম বয়সে মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা করার জন্য। হিন্দুত্বের বাড়াবাড়ি দেখে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশী আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। কলম ধরেছেন মুসলমান কৃষকদের পক্ষে। লিখেছেন ঘরে বাইরে উপন্যাস, গোরা। প্রতিদিন সত্যের মুখোমুখী দাঁড়াতেন বলে গান্ধীর সঙ্গে ভয়ানক মতবিরোধ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের। বিবেকানন্দ জীবিত অবস্থায় সারা ভারতে যখন আলোড়ন তুলেছেন, তাঁকে নিয়ে এক কলম লেখেননি তিনি। বরং বলেছেন বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়। রবীন্দ্রনাথ সামান্য কয়েকটি কথা লিখেছেন বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর।

বাংলার নবজাগরণবাদীরা সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখলেও, ভারতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধে তাঁদের ভূমিকাটাই প্রধান। ভারতবর্ষকে যে-অভিশাপ বর্তমানেও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ‘বাঙালি মুসলমান এবং মুসলমান কালচার’ প্রবন্ধে বাংলার তখনকার প্রগতিশীল বিদগ্ধ সমাজ সম্পর্কে গোপাল হালদার লিখেছেন, হিন্দুত্ব ও হিন্দু রীতিনীতিকে সহজভাবে তাঁদের কাছে মনে হলো “জাতীয়” ধারা। বাস্তবে এ এক শোচনীয় ভুল ছিল। মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালিরা হিন্দু-মুসলমান জনগণের থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল বলেই এ ভুল হয়েছিল।

সমস্ত উনিশ শতকের নবজাগ্রত প্রগতি আন্দোলন এই মারাত্মক ভুলের বশে এক ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদে’র আশ্রয় গ্রহণ করলো। হিন্দু শিক্ষিত সাধারণ কবি, ঔপনাসিক সকলেই তখন ‘হিন্দু ঐতিহ্যের’ কাঠামোকে আশ্রয় করে সৃষ্টিতে অগ্রসর হলেন। হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সংস্কৃতি মর্যাদা পেল না তাঁদের কাছে, মর্যাদা পেল বরং তার পাশ্ববর্তী সেই ‘হিন্দু ঐতিহ্যের’ অংশ। রাজনারায়ণ-বঙ্কিম-বিবেকানন্দ পর্যন্ত সকলেই সর্বভারতীয় হিন্দু ঐতিহ্যের প্রবল ধারাকে হিন্দু ঐতিহ্যের খাতে বহাতে সাহায্য করেছেন।

[গোপাল হালদার, ‘বাঙালি মুসলমান ও মুসলিম কালচার’] হালদার তাঁর প্রবন্ধে রামমোহন থেকে বিবেকানন্দ পর্যন্ত সকলকে বলছেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা আর বলছেন তাঁদের সৃষ্টিকর্ম ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে। কথাগুলি এর আগে পরে ভারতে আরো বহুবার আলোচিত হয়েছে। অন্নদা শংকর রায় অমলেন্দু দে, অমর দত্ত প্রমুখ সকলেই সেকথা বলেছেন। বাংলার নবজাগরণের বিরাট সমালোচক জওহরলাল নেহরু, অমলেন্দু দে, অন্নদা শংকর রায় প্রমুখ। বাংলার নবজাগরণের যাঁদের ধারক-বাহক বলা হয়, তাঁদের বড় অংশটাই ছিলেন হিন্দুত্বের পুনর্জাগরণ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে। বর্তমান প্রগতিশীলদের চিন্তায় হিন্দু জাতীয়তাবোধের পক্ষের সেই মানুষগুলিকে দেখা হচ্ছে, বিদগ্ধ মানুষ হিসেবে। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে ওয়াহাবি ঘরানার বা আরবের ইসলাম কিংবা খাঁটি মুসলমান হবার চিন্তাকে দেখা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীলতা হিসেবে। বর্তমান বিদগ্ধ সমাজের এই চিন্তা কতোটা যুক্তিযুক্ত?

বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে একদল খুবই কট্টর। বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয়ভাবে যারা কট্টর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, শাস্ত্রের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে কঠোরভাবে মেনে চলা। ধর্মের অনুুশাসন ও নির্দেশাবলীকে নিবেদিত চিত্তে বিশ্বাস করতে হবে, এই হলো তাদের কথা। ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে এরা সমাজের অগ্রগতির পথকে বিপর্যস্ত করছে। তাদের আক্রমণের মূল্য লক্ষ্য মানুষের ‘যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানচেতনা’। ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে তারা প্রবাহমান সমাজের গতিধারাকে রুদ্ধ করে দিতে চাইছে।

ইসলামের প্রাচীন রীতিনীতিগুলিকে পুনরায় আক্রে ধরে সভ্যতার অগ্রগতির অভিমুখটিকে পিছনে ফেরাতে চাইছে। মুসলমান কট্টরপন্থীরা ইসলামের শুদ্ধিকরণের নামে আরব ভূমির আদি পবিত্রতার উৎস সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশে এবং মুসলিম বিশ্বে এ ঘরানার লোকরা যথেষ্টভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে ও সারা বিশ্বের মুসলমানদের অধিকার রক্ষার নামে মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদরা এবং মুসলিম ধর্মীয় নেতারা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের ধারণাকে সামনে আনছে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান।

কিন্তু তবুও মুসলমানদের কট্টর নেতারা মনে করছেন বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। যদি তাদের দেয়া পশ্চাদপদ বিভিন্ন দাবি মেনে নেয়া হয়; তাহলেই বাংলাদেশে ইসলাম সুরক্ষিত হবে। জাতীয়তাবোধ অপেক্ষা ইসলামবোধের ধারণাটিকে তারা সামনে আনতে সচেষ্ট। মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই ধর্মীয় নেতারা সকল মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করে না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা কিন্তু ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের ধর্মীয় আবেগে গা না ভাসিয়ে বা কট্টর ধার্মিকদের খপ্পরে না পড়ে তাঁরা সহিষ্ণুতার পথ বেছে নিয়েছেন।

বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কিছু সংখ্যক মানুষ ধর্মীয় নেতাদের নির্দেশ অনেক সময় বিনাবাক্যে গ্রহণ করে। কখনো কখনো দাবি দাওয়ার প্রশ্নে হিংস্র হয়ে ওঠে। বিশ্বে কোনো ধর্মই হিংস্রতা সমর্থন করে না। বিশেষ করে ইসলাম কথাটির অর্থ হলো আত্মসমর্পণ বা শান্তি। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার নির্দেশ আছে ইসলাম ধর্মে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম নিয়ে নানান ধরনের বাড়াবাড়ি চলে বাংলাদেশে।

ইসলাম ধর্মে নারীর শিক্ষা আর কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসলমানরা নারীর শিক্ষাদান এবং কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের কট্টর ধার্মিকরা খুবই রক্ষণশীল আর প্রতিক্রিয়াশীল। মানুষের ধর্মনিষ্ঠাকে তারা প্রতিক্রিয়াশীলতার চাদরে মুড়ে দিতে চায়। নিজধর্মের বিশ্বাসীদের মধ্যে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের নামে হিংসার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে এরা প্রতিদিন।

বাংলাদেশের বর্তমানের ধর্মীয়ভাবে কট্টর মুসলমানদের সবচেয়ে খারাপ দিকটি হচ্ছে নারীকে মর্যাদা না দেয়া। নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করা। বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মের এসব চরমপন্থীরা সর্বদা পুরানো দিনের ইসলামের গৌরব নিয়ে বিভোর আর তার পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চায়। ইংরেজ শাসনে অবিভক্ত বাংলায় ঠিক একইভাবে শুরু হয়েছিল হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের তত্ত্ব। বিদগ্ধ হিন্দুরা তখন মনে করতেন হিন্দুত্ববাদের পুরনুজ্জীবনের মাধ্যমে ফিরে যেতে হবে প্রাচীন ভারতের এক কল্পিত স্বর্ণযুগে।

১৮৭২ সালে রাজনারায়ণ বসুর ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’ শীর্ষক বক্তৃতা থেকেই হিন্দু পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, বিবেকানন্দ প্রমুখ এই হিন্দু জাগরণের আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন।

বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে যারা কট্টর, যারা নানাভাবে ইসলাম ধর্মের পুনরুজ্জীবনের কথা বলে; বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ তাদেরকে সামান্য সম্মান দেখান না। কিন্তু খুবই বিস্ময়কর যে, বাংলার হিন্দু পুনরুজ্জীবনের প্রবর্তকরা সকলেই খুব সম্মানিত এখানে এবং ভারতবর্ষে। বিবেকানন্দের সম্মান তো সারা বিশ্বব্যাপী। যিনি ছিলেন কট্টর হিন্দু।

তিনি বক্তৃতার মঞ্চে বহুসময় মানুষের অন্তর বিগলিত করার মতো সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন কিন্তু দিনের শেষে তিনি ছিলেন নির্ভেজাল ধর্মান্ধ হিন্দু। ভারতবর্ষে হিন্দুত্বের প্রচার আর প্রসারের জন্যেই তাঁর এ সম্মান। হিন্দু ধর্মপ্রচারের জন্য যদি তিনি সম্মান পেতে পারেন, তাহলে ভিন্ন মানুষরা কেন খ্রিস্টান ধর্ম বা ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সম্মান লাভ করবেন না? বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের সকল পশ্চাদপদতা আর কুসংস্কারকে কেনাবেচা করেছেন। তিনি যদি সেটা করেই সমগ্র ভারতবর্ষে এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার আসন লাভ করতে পারেন, মুসলমান একজন ধর্মীয় নেতা খাঁটি ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য নানারকম কুসংস্কারকে আগলে ধরলে তিনি সেই সম্মান পাবেন না কেন?

বাংলাদেশের গোঁড়া মুসলমানদের পক্ষ নেয়া বক্ষ্যমান প্রবন্ধকারের লক্ষ্য নয়। কিন্তু ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধান করতেই হবে। মূল বক্তব্য হলো, প্রায় একই দোষে দোষী দুপক্ষকে দুভাবে বিচার করবার কারণটা কী? হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের সম্মানের চোখে দেখা আর মুসলামান প্যান ইসলামিক দলকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে ভাবাটা কি ন্যায়বিচার হতে পারে? যদি বাংলাদেশের মুসলমানরা কট্টরতার জন্য নিন্দনীয় হয়; বিবেকানন্দ বা তাঁর মতো সকলে সেটা হবেন না কেন? স্বামী বিবেকানন্দ যদি পশ্চাদপদ-কুসংস্কার আচ্ছন্ন হিন্দুত্বের বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচার করে নায়ক হতে পারেন, ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তাহলে কেন একজন মুসলমান নেতা প্রগতিশীলদের চোখে খলনায়ক বনে যাবেন? বিবেকানন্দ ছিলেন হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানবাদীদের দলে, বিবেকানন্দ লেখাগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে তাই দাঁড়ায়।

রাজনারায়ণ বসুকে বলা হয়েছে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের প্রবর্তক। তিনিই উৎসাহ দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের বাংলায় ঠাকুর বাড়ির অর্থানুকূল্যে ১৮৬৭ সালে ‘হিন্দুমেলা’ চালু করেছিলেন। হিন্দুমেলার মধ্য দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার বার্তা দেয়া হয়েছিল। বাংলার মুসলমানকে সেখানে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখা হয়নি। রাজনারায়ণ বসু ভারতের মুসলমানদের ভারতীয় জাতীয়তাদের বাইরে রাখতে চেয়েছেন। ভারতের জাতীয়তাবাদ তাঁদের চোখে শুধু হিন্দুদের; যা হিন্দু জাতীয়তাবাদ।

হিন্দুমেলার নামকরণের মধ্য দিয়ে ভাবীকালের সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা লক্ষ্য করে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষন সম্পাদিত মাসিক ‘আর্যদর্শন’ পত্রিকায় ‘আধুনিক ভারত’ শীর্ষক প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছিল, ‘আমরা মেলার অধ্যক্ষদিগের নিকট করজোড়ে এই ভিক্ষা চাই, তাহারা যেন এই মেলাকে কোন সঙ্কীর্ণ ভিত্তির উপর ন্যস্ত না করেন। আমাদিগের ভিক্ষা তাহারা যেন এই মেলাকে এখন হইতে হিন্দুমেলা নাম না দিয়া ভারতমেলা নাম দেন।

যেন ইহা হইতে ভারতবাসী মাত্রেরই উৎসব স্থান হয়। হিন্দু ভিন্ন অন্য কোন জাতি ইহাতে যোগ না দেন; আমরা কাঁদিব। কিন্তু ভারতবর্ষীয় কোন ভ্রাতার বিরুদ্ধে ইহার দ্বার অবরুদ্ধ রাখিব না।’ [মাসিক আর্য্যদর্শন, মাঘ ১২৮৩] পরবর্তী সময় হিন্দুমেলার নাম করণ করা হয় চৈত্র সংক্রান্তি মেলা। পরবর্তীকালে আর্যদর্শন পত্রিকাটিও তার এই অসাম্প্রদায়িক উদার মনোভাব রক্ষা করতে পারেনি। শীঘ্রই পত্রিকাটি হিন্দুত্বের প্রচারক হয়ে দাঁড়ায়। এক দশক বাদেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রাবল্য দেখা এই পত্রিকায়। [অমর দত্ত, ঊনিশ শতকের শেষার্ধে বাঙলাদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদ]

বিবেকানন্দ নানা সময়ে সুন্দর সুন্দর কথা বললেও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী রাজনারায়ণ বসুর চেয়ে খুব আলাদা কিছু ছিলেন না। বিবেকানন্দের লেখা থেকে তার প্রমাণ মিলবে। বিবেকানন্দের মূল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পরে তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে পরিচিত হন। স্বামী বিবেকানন্দ নামেই তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন ‘স্ত্রী-শিক্ষা’। বিবেকানন্দের বেশির ভাগ লেখা ইংরেজিতে, সামান্য কিছু বাংলায়, বাংলা লেখার মধ্যে একটি ‘স্ত্রী-শিক্ষা’। প্রবন্ধে তিনি স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলেছেন।

বিবেকানন্দকে তাই খুব প্রগতিশীল মানুষ বলেই প্রথমে ভ্রম হতে পারে। তিনি স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ভারতের অধঃপতন হইল, ভট্টাচার্য-ব্রাহ্মণেরা ব্রাহ্মণেতর জাতিকে যখন বেদপাঠের অনধিকারী বলিয়া নির্দেশ করিলেন, সেই সময়ে মেয়েদেরও সকল অধিকার কাড়িয়া লইলেন।’ [স্বামী বিবেকানন্দ, ‘স্ত্রী-শিক্ষা’] বিবেকানন্দ নারীর সেই অধিকার পুনরায় ফিরিয়ে দিতে চাইছেন। ভারতীয় নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে চাইছেন। তিনি নারীদের কোন্ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাইছেন সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাচীন বৈদিক ধর্মের শিক্ষায় তিনি নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে চান। হিন্দুত্বের জাগরণবাদী বিবেকানন্দ চাইছেন, ভারতের সকল নারীরা হবে সীতার মতো পবিত্র। তিনি রাখ ঢাক না করে খুব স্পষ্ট করেই এ কথা বলেছেন যে, তাঁর কাম্য নারীরা হবেন সীতা সমতুল্য। প্রত্যেক ভারতীয় নারীকে ‘সীতা’র চরিত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার জন্যই শিক্ষা দিতে হবে।

বিবেকানন্দ লিখেছেন, ‘ভারতীয় রমণীগণের যেরূপ হওয়া উচিত, সীতা তাহার আদর্শ; রমণীচরিত্রের যতপ্রকার ভারতীয় আদর্শ আছে, সবই এক সীতা-চরিত্রেই আশ্রিত; আর সমগ্র আর্যাবর্তভূমিতে এই সহস্র বর্ষ ধরিয়া তিনি এখানকার আবালবৃদ্ধবনিতার পূজা পাইয়া আসিতেছেন। মহামহিমময়ী সীতা স্বয়ং শুদ্ধা হইতেও শুদ্ধতরা, সহিষ্ণুতার চূড়ান্ত আদর্শ সীতা চিরকালই এইরূপ পূজা পাইবেন। যিনি বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রদর্শন না করিয়া সেই মহাদুঃখের জীবন যাপন করিয়াছিলেন, সেই নিত্যসাধ্বী নিত্যাবিশুদ্ধস্বভাবা আদর্শপত্নী সীতা..। ভারতীয় নারীগণকে সীতার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া আপনাদের উন্নতিবিধানের চেষ্টা করিতে হইবে। ইহাই ভারতীয় নারীর উন্নতির একমাত্র পথ।’ কট্টর মোল্লার মতো বিবেকানন্দ নারীর উন্নতির একমাত্র পথ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বিবেকানন্দের মতে নারীর উন্নতির আর কোনো পথ থাকতে পারে না। তিনি লিখেছেন, ‘সব পুরাণ নষ্ট হইয়া যাইতে পারে, এমনকি আমাদের বেদ পর্যন্ত লোপ পাইতে পারে, আমাদের সংস্কৃতভাষা পর্যন্ত চিরদিনের জন্য কালস্রোতে বিলুপ্ত হইতে পারে, কিন্তু আমার বাক্য অবহিত হইয়া শ্রবণ কর, যতদিন পর্যন্ত ভারতে অতিশয় গ্রাম্যভাষাভাষী পাঁচজন হিন্দুও থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত সীতার উপাখ্যান থাকিবে। সীতা আমাদের জাতির মজ্জায় মজ্জায় প্রবিষ্ট হইয়াছেন, প্রত্যেক হিন্দু নরনারীর শোণিতে সীতা বিরাজমান।’

বিবেকানন্দের কথার মধ্যে সবজান্তার ভাব এবং স্পষ্ট পুরোহিতের কর্র্তৃত্বকামী সুর। তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, তিনি যা বলছেন তা বেদবাক্য, তার নড়চড় হতে পারে না। তিনি সব ইতিহাস জেনে বসে আছেন। কট্টর চিন্তার ধারক আর কাকে বলে! কিন্তু তিনি ভারতবর্ষেই বিরাট জ্ঞানী এবং শ্রদ্ধাশীল মানুষ। ভারতবর্ষে যেসব মানুষ হিন্দুধর্মের জয়গান গেয়েছে, তারাই সবচেয়ে শ্রদ্ধাশীল মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গান্ধী আর সাভারকারের নাম একইভাবে সত্য। স্বয়ং গান্ধী রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা আর গোরক্ষা করার আন্দোলনে যোগ দেয়ার পরেও, ভারতবর্ষে শ্রদ্ধাশীল মানুুষ। গান্ধীর তথাকথিত গোরক্ষা আন্দোলনের জন্য ভারতবর্ষে হাজার হাজার দাঙ্গার ঘটনা ঘটছে। তবুও গান্ধী কখনো ধর্মীয়ভাবে গোঁড়া বলে পরিচিত নন। ভারতে বিজেপি আজ যা করছে, আরো অনেকের সঙ্গে মিলে গান্ধী তার বীজ রোপন করে গেছেন। কিন্তু মুসলমানরা যখন কট্টর আচরণ করে তখন তাদের নামে তকমা লেগে যায়। মুসলমানরা তখন জঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের কট্টর মুসলমান, জঙ্গী মুসলমানদের সমর্থন করার সামান্য কারণ নেই। খুব সত্যি কথা যে, জঙ্গী বা কট্টর মুসলমানরা ইতিহাসকে পিছনে নিয়ে যেতে চাইছে। সর্বদা তাদের সমালোচনা করবে প্রগতিশীল মানুষ সেটাই সঠিক পথ। কিন্তু বাকিরা কেন সমালোচিত হবে না? মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় নেতারা যদি কট্টর চিন্তার জন্য দায়ী হয়, ঘৃণিত হয়; ভিন্ন ধর্মের লোকরা তা হবে না কেন?

বিবেকানন্দ তাঁর প্রবন্ধে আর কী বলেছেন। তিনি ধারণা দিচ্ছেন, ‘ভারতীয় রমণীগণ সর্বাপেক্ষা উচ্চ আকাঙ্ক্ষা, বিশুদ্ধস্বভাবা, পতিপরায়ণা, সর্বংসহা সীতার ন্যায় হওয়া। সমগ্র ভারতবাসীর সমক্ষে সীতা যেন সহিষ্ণুতার উচ্চতম আদর্শরূপে বর্তমান রহিয়াছেন। সীতা যেন ভারতীয় ভাবের প্রতিনিধিস্বরূপা, যেন মূর্তিমতী ভারতমাতা।..নারীগণের মধ্যে আমরা যে ভাবকে নারীজনিত বলিয়া শ্রদ্ধা ও আদর করিয়া থাকি সীতা বলিতে তাহাই বুঝাইয়া থাকে।’ তিনি বলছেন, ‘জাতির জীবনে পূর্ণ ব্রহ্মচর্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে প্রথমত বৈবাহিক সম্বন্ধকে পবিত্র ও বিচ্ছেদহীন করিতে হইবে…হিন্দুগণ বিবাহকে পবিত্র ও অবিচ্ছেদ্য করিয়া বহু শক্তিশালী স্ত্রী-পুরুষ সৃষ্টি করিয়াছেন। আরবদের দৃষ্টিতে বিবাহ একটি চুক্তি, একটা বলপূর্বক অধিকারমাত্র; উহা ইচ্ছামত ভাঙ্গিয়া দেওয়া যাইতে পারে। সুতরাং আমরা তাহাদের মধ্যে ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মচারিণীর আদর্শ পাই না।..ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচারিণী সৃষ্টির জন্য সর্বসাধারণের বৈবাহিক জীবনকে পূণ্যময় করিয়া তোলা আবশ্যক। এদেশে প্রত্যেক বালিকাকে সাবিত্রীর ন্যায় সতী হইতে শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে; মৃত্যুও তাঁহার প্রেমের নিকট পরাভূত হইয়াছিল। তিনি ঐকান্তিক প্রেম-বলে যমের নিকট হইতেও নিজ স্বামীর আত্মাকে ফিরাইয়া লইতে সমর্থ হইয়াছিলেন।’

বিবেকানন্দ বিবাহকে দুপক্ষের চুক্তি বলে মানতে নারাজ। তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ চান না। তিনি চান সতী সাধ্বী রমণী, যিনি স্বামীর অবাধ্য হবেন না; স্বভাবতই বিবাহ বিচ্ছেদের তাহলে আর কারণ থাকে না। তিনি নারীদেরকে শিক্ষা দিতে চান ভবিষ্যতে একান্ত বাধ্যগত পতিপরায়ণা হবার জন্য; বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগ যখন আর সমাজে থাকবে না, যিনি স্বামীর সঙ্গে চুক্তি করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন না; বিবাহ করবেন পুরোহিতের মন্ত্র পাঠ দ্বারা। বিবেকানন্দ আস্ফালন করে যাই বলুন, ভারতীয়রা শেষপর্যন্ত তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। বাস্তবতার পথ ধরে হেঁটেছে। বিবেকানন্দের দুর্ভাগ্য যে, ভারতে বিয়ে এখন একটা চুক্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ করার আইন আছে। ফলে ভারতীয়রা আরবদেরকে অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছে; ধর্মের বন্ধন শিথিল করার জন্য। ধর্মীয় মন্ত্র পাঠ করেই অধিক বিবাহ হচ্ছে; কিন্তু তারা কেউ সীতা নন। বিবাহের সময় তাদের চুক্তি করবার অধিকার রয়েছে আর সেই সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের। ভারতীয়রা বিবেকানন্দের আদর্শের চেয়ে আরবদের আদর্শকে সুবিধাজনক বা প্রগতিশীল মনে করেছে। নারীর সম্পত্তির অধিকার পর্যন্ত স্বীকার করা নেয়া হয়েছে ভারতীয় আইনে।

বিবেকানন্দ কীরকম গোঁড়া ছিলেন তাঁর এই প্রবন্ধের প্রতিটি বাক্যে তা স্পষ্ট। নারীর স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন না, না নারীর সমান হওয়ার অধিকারে। তিনি বিশ্বাস করতেন একমাত্র নারীর ‘সীতা’ হয়ে ওঠায়; আর মহামানব বিবেকানন্দ নারীকে সেইটুকুই শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের একটা শিক্ষা তো সহজে দেওয়া যাইতে পারে; হিন্দুর মেয়ে সতীত্ব কী জিনিস তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবে; ইহাতে তাহারা পুরুষানুক্রমে অভ্যেস্ত কিনা! প্রথমে সেই ভাবটাই তাহাদের মধ্যে উসকাইয়া দিয়া তাহাদের চরিত্র গঠন করিতে হইবে; যাহাতে তাহারা বিবাহিত হউক, বা কুমারী থাকুক, সকল অবস্থাতেই সতীত্বের জন্য প্রাণ দিতে কাতর না হয়।’ তিনি লিখেছেন, ‘নারীদিগের সম্বন্ধে আমাদের হস্তক্ষেপ করিবার অধিকার তাহাদিগকে শিক্ষা দেওয়া পর্যন্ত; নারীগণকে এমন যোগ্যতা অর্র্জন করাইতে হইবে, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই নিজেদের ভাবে মীমাংসা করিয়া লইতে পারে।’ ‘সীতা, সাবিত্রী, দয়মন্তী, লীলাবতী, খনা, মীরা; ইঁহাদের জীবন চরিত্র মেয়েদের বুঝাইয়া দিয়া তাহাদের নিজেদের জীবন ওইরূপে গঠিত করিতে হইবে।’ বিবেকানন্দ নারীদের স্বাধীনভাবে শিক্ষিত হতে দিতে চান না, তিনি তাদের ছাঁচে ফেলে সেই মাপে গড়ে তুলতে চান। নারীদের সেই শিক্ষা দেবার লক্ষ্যে তিনি মঠস্থাপন করতে চান।

মঠস্থাপন সম্পর্কে বিবেকানন্দ কী বলেছেন। তিনি লিখেছেন, গঙ্গার ওপারে একটা প্রকাণ্ড জমি লওয়া হইবে। তাহাতে অবিবাহিতা কুমারীরা থাকিবে, আর বিধবা ব্রহ্মচারিণীরা থাকিবে; আর ভক্তিমতী গৃহস্তের মেয়েরা মধ্যে মধ্যে আসিয়া অবস্থান করিতে পারিবে। এই মঠে পুরুষদের কোনোরূপ সংস্রব থাকিবে না। পুরুষ মঠের বয়োবৃদ্ধ সাধুরা দূর হইতে স্ত্রী-মঠের কার্যভার চালাইবে। ..জপ, ধ্যান, পূজা; এইসব তো শিক্ষার অঙ্গ থাকিবেই। যাহারা বাড়ি ছাড়িয়া একেবারে এখানে থাকিতে পারিবে, তাহাদের অন্নবস্ত্র এই মঠ হইতে দেওয়া হইবে। ..মেয়েদের ব্রহ্মচর্যকল্পে এই মঠে বয়োবৃদ্ধা ব্রহ্মচারিণীরা ছাত্রীদের শিক্ষার ভার লইবে। এই মঠে ৫/৭ বৎসর শিক্ষার পর মেয়েদের অভিভাবকেরা তাহাদের বিবাহ দিতে পারিবে। যোগ্যাধিকারিণী বলিয়া বিবেচিত হইলে অভিভাবকদের মত লইয়া ছাত্রীরা এখানে চিরকুমারী-ব্রতাবলম্বনে অবস্থান করিতে পারিবে। যাহারা চিরকুমারী-ব্রত অবলম্বন করিবে, তাহারাই কালে এই মঠের শিক্ষয়িত্রী ও প্রচারিকা হইয়া দাঁড়াইবে এবং গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে শিক্ষাকেন্দ্র খুলিয়া মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারে সহায়তা করিবে।’ বিবেকানন্দের শিক্ষাবিস্তার মানে সীতার সংখ্যা বাড়িয়ে তোলা। বিবেকানন্দ আশা করেন সারা ভারতের রমণীরা সকলে ‘সীতা’ হয়ে যাক। মুসলমান অনেক কট্টর ধর্মীয় নেতারা যেমন নারীর আদর্শ হিসেবে নবীর স্ত্রী ‘আয়েশা’র উদাহরণ দেন, বিবেকানন্দের কাছে নারীর উদাহরণ মানে সীতা। দুপক্ষের চিন্তায় রয়েছে নানারকম মিল, নিজ নিজ ধর্ম প্রচারের পক্ষে সেগুলিকে তারা ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশের মোল্লাদের সঙ্গে সেখানে নারীর জীবন যাপন প্রশ্নে বিবেকানন্দের পার্থক্য কোথায়? দুপক্ষই শেষবিচারে নারীকে পতিপরায়ণ, সতীসাধ্বী এবং সর্বসহা বলে মনে করেন। বিবেকানন্দের কাছে নারী কখনো পুরুষের সমান নয়।

বিবেকানন্দ ভারতের নারীদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এ সীতা-সাবিত্রীর দেশ, পুণ্যক্ষেত্র ভারতে এখনও মেয়েদের যেমন চরিত্র, সেবাভাব, স্নেহ, দয়া, তুষ্টি ও ভক্তি দেখা যায়, পৃথিবীর কোথাও তেমন দেখিলাম না। পাশ্চাত্যে মেয়েদের দেখিয়া আমার অনেক সময় স্ত্রীলোক বলিয়াই বোধ হইতো না; ঠিক যেমন পুরুষ মানুষ। গাড়ি চালায়, অফিসে যায়, স্কুলে যায়, প্রফেসারি করে! একমাত্র ভারতবর্ষেই মেয়েদের লজ্জা বিনয় দেখিয়া চক্ষু জুড়ায়।’ বিবেকানন্দ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, নারী পুরুষের মতো গাড়ি চালাবে, চাকরি করবে, অধ্যাপনা করবে তা নারীর আদর্শ হতে পারে না। নারী হবে লজ্জাবনত। বিবেকানন্দের চরিত্রের কিছুটা স্ববিরোধিতা এখানে ধরা পড়বে। তিনি প্রবন্ধটির শুরুতে নারীর অবস্থার কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন। তিনি দেখিয়েছেন নারীরা সেখানে কতো ভালো আছে। তিনি নারী শিক্ষার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সেই দেশে দরিদ্র একরূপ নাই বলিলেই চলে এবং অন্য কোথাও মেয়েরা ওই দেশের মেয়েদের মতো স্বাধীন, শিক্ষিত ও উন্নত নহে। ইহাদের রমণীগণ সকল স্থানের রমণীগণ অপেক্ষা উন্নত। মহিলাগণ সমুদয় জাতীয় উন্নতির প্রতিনিধিস্বরূপ। পুরুষেরা কার্যে অতিশয় ব্যস্ত বলিয়া শিক্ষায় তত মনোযোগ দিতে পারে না। মহিলাগণ প্রত্যেক বড়ো বড়ো কার্যের জীবনস্বরূপ।..হাজার হাজার মেয়ে দেখিয়াছি। সকল কাজ তাহারাই করে। স্কুল, কলেজ মেয়েতে ভরা। আমাদের পোড়া দেশে মেয়েদের পথ চলিবার উপায় নেই।’ পরক্ষণে তিনি মনের কথাটা বলে দিয়েছেন, তেমন নারী তিনি ভারতে দেখতে চান না। তিনি চান সীতাকে, সীতার প্রতিমূর্তি গড়তে চান তিনি ভারতে।

বিবেকানন্দ বহু কিছু বলেছেন যা প্রথম বিচারে মনে হবে মহৎ বাণী। তিনি ভারতের দরিদ্র মানুষ বা নিম্নশ্রেণীর মুক্তির কথা বলেছেন। দরিদ্র মানুষের শিক্ষার কথা বলেছেন। কিন্তু শিক্ষা বলতে তিনি প্রধানত বুঝতেন আধ্যাত্মিক শিক্ষা, বেদ বেদাঙ্গ সম্পর্কে শিক্ষা। বিবেকানন্দ নারীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে মাতৃরূপে পূজা করার কথা বলেছেন। সত্যি বলতে তাঁর এসব বক্তব্যের পিছনে ছিল চরম আবেগ, হিন্দুত্বের আবেগ। যুক্তিবোধ বা আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল না। তিনি নারীর পক্ষে খুব জোর গলায় বলছেন, ‘যাহারা বিশুদ্ধভাবে, সাত্ত্বিকভাবে, মাতৃপূজা করিবে, তাহাদের কী কল্যাণ না হইবে?..শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু নারীপূজা বলিতে বুঝিতেন, সকল নারী সেই আনন্দময়ী মা ব্যতীত কিছুই নহেন; তাঁহারই পূজা।..ইহাই আমাদের প্রয়োজন। মেয়েদের পূজা করিয়াই সব জাতি বড়ো হইয়াছে। যে দেশে, যে জাতিতে মেয়েদের পূজা নাই, সে দেশ, সে জাতি কখনও বড়ো হইতে পারে নাই, কস্মিমকালে পারিবে না।’ বিবেকানন্দের এ কথাগুলি নতুন কিছু নয়। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কট্টর নেতা মনু ঠিক একথাগুলিই বলেছিলেন। বিবেকানন্দ তা নকল করেছেন মাত্র।

মনু বলেছিলেন, ‘যেখানে নারীরা পূজিত হন না, সেখানে দেবগণ তুষ্ট হন না। নারীকে তুষ্ট না করলে সর্ব কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। নারী অসম্মানিতা হয়ে অভিশাপ দিলে সব দিক বিনষ্ট হয়।’ কিন্তু সমগ্র মনু সংহিতায় নারী বন্দনার এই শ্লোকের কোনো প্রতিফলন নেই। মনু নারীকে কোনো রূপেই স্বাধীনতা দিতে চাননি। নারী সারাজীবন পুরুষের অধীনতা স্বীকার করে বেঁচে থাকবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। স্বামী বা পুরুষকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন; স্ত্রীলোকদের দিনরাত পরাধীন রাখবে। স্ত্রীলোক স্বাধীনতার যোগ্য নয়। স্ত্রীলোক কুমারী জীবনে পিতার, যৌবনে স্বামীর আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকবে। মনুর বিধানে নারীর নিজের দেহের উপর তার নিজের কোনো অধিকার ছিল না। মনু নারীর স্বভাবকে খুব মন্দ করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নারীর স্বভাবই হলো পুরুষদের দুষিত করা।’ মনু নারীদের এতটাই অবিশ্বাস করেছেন যে বিধান দিয়েছেন; মা, বোন বা মেয়ের সঙ্গে শূন্যগৃহাদিতে পুরুষ থাকবে না। [কঙ্কর সিংহ, মনুসংহিতা এবং নারী]

মানবধর্মশাস্ত্র মনুসংহিতায় কন্যা-শিশুর জন্য বিবাহই ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য সংস্কার। মনুর ধর্মশাস্ত্রে নারীর জন্য বিবাহ ছিল বাধ্যতামূলক। [কঙ্কর সিংহ, মনুসংহিতা এবং নারী] মনু নারীকে শিক্ষা লাভের অধিকার দেননি। তিনি বলেছেন, দ্বিজরা শিখতে পারবে; যারা উপনয়ন গ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিজ হয়েছেন। নারী এবং শূদ্রদের জন্য মনু উপনয়ন এবং শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় কন্যা হলেও নারী শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে না। [কঙ্কর সিংহ, মনুসংহিতা এবং নারী] বিবেকানন্দ নারীকে শিক্ষার অধিকার দিয়েছেন, সে কারণে মনে হতে পারে তিনি বিপ্লবী। মনে হতে পারে নারীর অধিকারের প্রশ্নে তিনি মনুর বিধানকে উল্টে দিয়েছেন। বাস্তবে নারী শিক্ষা বলতে তিনি যা বুঝিয়েছেন, ঠিক তা মনুর বিধানের সঙ্গেই মানান সই। নারীকে পুরুষের অধীনতা মানবার শিক্ষাদানের কথা তিনি বলেছেন। তিনি শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে নারীকে পতিপরায়ণা বা ধর্মপ্রচারের পুরোহিত বানিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। নারীকে তিনি বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করার চেয়ে বৈরাগ্য পালনে অধিক উৎসাহ যুগিয়েছেন। তিনি বৈরাগ্য পালনকে ধর্মরক্ষার পথ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

তিনি সবার আগে স্থান দিয়েছেন ধর্মকে, ধর্ম মানে সনাতন ধর্ম। তিনি লিখেছেন, শিক্ষাই বলো আর দীক্ষাই বলো ধর্মহীন হলে তাতে গলদ থাকবেই। ধর্ম ভিন্ন অন্য শিক্ষাটা গৌণ হবে। ধর্মশিক্ষা, চরিত্রগঠন, ব্রহ্মচর্য-ব্রতোদ্যাপন; এই জন্য শিক্ষার দরকার। বর্তমানে ভারতে যে স্ত্রী শিক্ষা দেওয়া হয় তাতে ধর্মটাকে গৌণ করে রাখা হয়েছে; সেজন্যই শিক্ষার মধ্যে নানারকম দোষ দেখা দিয়েছে। স্ত্রীদের তাতে দোষ নেই, সংস্কারকেরা নিজে ব্রহ্মজ্ঞ না হয়ে স্ত্রী শিক্ষা দিতে অগ্রসর হওয়াতে এরকম দোষ ঘটেছে। আমি ধর্মকেই শিক্ষার সার বলে মনে করি। খুব স্পষ্ট বিবেকানন্দের বক্তব্য, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা চাচ্ছেন না; তিনি চান ধর্মীয় শিক্ষা। বিবেকানন্দ যে কোনো বিচারেই একজন কট্টর ধার্মিক বা ধর্মান্ধ; বাংলাদেশের বর্তমান ধর্মান্ধদের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর সামান্য পার্থক্য নেই। ধর্মান্ধদের মতো নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করাই তাঁর প্রধান কাজ। নিজধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি পুরুষগণকে যাহা বলিয়া থাকি, রমণীগণকেও ঠিক তাহাই বলিব। ভারত এবং ভারতীয় ধর্মে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা স্থাপন কর; তেজস্বিনী হও, আশায় বুক বাঁধ; ভারতে জন্ম বলিয়া লজ্জিত না হইয়া উহাতে গৌরব অনুভব কর; আর স্মরণ রাখিও, আমাদের অপরাপর জাতির নিকট হইতে কিছু লইতে হইবে বটে, কিন্তু জগতের অন্যান্য জাতি অপেক্ষা আমাদের সহস্রগুণে অপরকে দিবার আছে। দেশীয় নারী দেশীয় পরিচ্ছদে ভারতের ঋষিমুখাগত ধর্ম প্রচার করিলে, আমি দিব্যচক্ষে দেখিতেছি এক মহান তরঙ্গ উঠিবে যাহা সমগ্র পাশ্চাত্যভূমি প্লাবিত করিয়া ফেলিবে। বিবেকানন্দের সঙ্গে বাংলার ধর্মান্ধদের চিন্তার সামান্য পার্থক্য আছে কি? নিজধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করেই তিনি ক্ষান্ত নন, তিনি সারা পাশ্চাত্যভূমিকে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করাতে চান। বর্তমানের জঙ্গী মুসলমান ধার্মিকরা যেমন সারাবিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান।

রামমোহন এবং তার পরবর্তী যুগটা ছিল হিন্দুত্ব বা বৈদিক যুগ নিয়ে গর্ব করা, প্রাচীন ভারতের সবকিছুকে বড় করে দেখা আর তথাকথিত হিন্দুত্বের পুনরুত্থানের যুগ। কারণ আসলে ভারতে ‘হিন্দু’ বলে কোনো ধর্ম ছিল না, বৈদিক ধর্মকে তাঁরা হিন্দু নামকরণ করেছিলেন। কথাটা হলো ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি যদি তৎকালীন বাংলার প্রগতিশীলতার লক্ষণ হয়, মুসলমানদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কেন প্রতিক্রিয়াশীলতা হবে? সন্দেহ নেই, রামমোহন-বিবেকানন্দদের সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় বাড়াবাড়ির সামান্য পার্থক্য রয়েছে। রামমোহনরা একদিকে বিজ্ঞান চর্চার কথা বলে ভিন্ন দিকে ধর্মের পরিচয়কেই বড় করে তুলেছিলেন। ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া পাশ্চাত্যের সকল আধুনিকতার সুবিধা নিতে ছাড়েননি, পাশাপাশি ধর্মীয় বিলাসিতা বাদ দেননি। নিশ্চয় সে বিচারে তাঁরা কিছুটা ভিন্ন পথের লোক। বাংলাদেশের বর্তমান কট্টরপন্থীরা ধর্মের জন্য বিজ্ঞানের সব সুফল বাতিল করার পক্ষে, রামমোহন আর বিবেকানন্দরা তা করেননি। রামমোহন-বিবেকানন্দরা ইংরেজি শিখেছেন, খ্রিস্টানদের জগতে গিয়ে নিজেদের বাণী প্রচার করেছেন। পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেননি। বাংলাদেশের বর্তমান কট্টরপন্থীরা নিজেদের দৃষ্টিটা কল্পিত আরবমুখী করে রেখেছেন। যদিও আরব-বিশ্ব ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সবটুকু গ্রহণ করছে, নিজেদের ক্রমশ পাল্টে ফেলছে।

রামমোহন বিবেকানন্দের সময়টা নিয়ে গোপাল হালদার খুব চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, বিশেষ সত্য লক্ষণীয় এই যে, উনিশ শতকের বাংলা সংস্কৃতির কাঠামোই হিন্দু, তার প্রাণ কিন্তু বুর্জোয়া সংস্কৃতির। মধুসূদনের কথাতো নেই, বঙ্কিমও প্রাণপণে চাইছেন মিল, কোৎ-এর বাণীকে স্বদেশীয় কায়দায় রূপ দিতে। বুর্জোয়া সভ্যতার মূল সত্য কথা হলো মানবতাবাদ; ধর্মতত্ত্বের ভিতরে বঙ্কিম পাশাপাশি উপন্যাসে, প্রবন্ধে ধরতে চেয়েছেন এই সত্যকে; মানবতাবাদকে পুরতে চাইছেন ‘হিন্দু কাঠামোতে’। বুর্জোয়া প্রাণশক্তিকে বাঁধতে চেয়েছেন তাঁরা হিন্দুত্বের গৌরবের ভিতরে। ব্রাহ্ম ও উদারনৈতিক সংস্কারবাদীরা এ কাঠামোকে ততটা গুরুত্ব দিতেন না। তাঁদের ধর্ম আন্দোলন ও কর্ম আন্দোলনে তা অনেকটা স্পষ্ট। কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা চাইতেন সেই জাতীয় আধারকে হিন্দু আধারে নতুন প্রাণ সঞ্জীবিত করতে। [ গোপাল হালদার, ‘বাঙালি মুসলমান ও মুসলিম কালচার’] মূলত সবকিছুর পর সেটা ছিল হিন্দুত্বের পক্ষে তরবারি ধরা। রাজনারায়ণ বসু খুব সম্মানিত মানুষ অবিভক্ত বাংলার। হিন্দুত্বের পক্ষে তিনি ‘সে কাল আর এ কাল’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমি বিলাতে যাইবার প্রতিপক্ষ নহি। বিলাতে যাইলে অনেক উপকার আছে; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, যাঁহারা বিলাত হইতে ফিরিয়া আইসেন, তাঁহারা হিন্দু সমাজের সহিত একেবারে সম্বন্ধ পরিত্যাগ করেন।’ সামান্য পরেই তিনি লিখেছেন, ‘কী এত মূঢ় হইয়াছি যে, ভারতমৃত্তিকার মঙ্গলপ্রসূনস্বরূপ ব্রহ্মপ্রতিপাদক বেদ বেদান্ত উপনিষদাদি শাস্ত্র ত্যাগ করিব? এই সকল ধর্মভাব, এই সকল ব্রহ্মজ্ঞানশাস্ত্র, যাহারা গুরু ভাবের সহিত শতকোটি বাইবেল, ইঞ্জিল, তওরেৎ, জবুর, কোরান ও আবেস্তা এবং র্পার্ক, নিউম্যান, কান্ট, কুজিন প্রভৃতির স্তূপায়মান সমতুল্য হয় না, তাহাতে আমাদের যে আত্মীয় ও স্বজাতীয় এই দ্বিবিধ অধিকার যুগপৎ আছে, তাহা মনে করিলেও পিতামহ পুরাণ পরমেশ্বরকে শত শত ধন্যবাদ প্রদান করিতে হয়।’ [ রাজনারায়ণ বসু, ‘সে কাল আর এ কাল’]

লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে, রাজনারায়ণ অতীতকে বড় করে দেখেছেন যখন বেদ বেদান্তের প্রচুর চর্চা হতো। তিনি আরো বলছেন, বেদ বেদান্তের সমতুল্য আর কোনো গ্রন্থ নেই। তিনি কান্ট বা অন্যান্য মনীষীদের দর্শনকে পর্যন্ত বেদ-এর কাছে স্থান দিতে রাজি নন। তিনি তার পরের পংক্তিতেই লিখেছেন, ‘উল্লিখিত মহাশাস্ত্র সকলকে মূল করিয়া ধর্মসংস্কার কার্যে আমাদিগের প্রবৃত্ত হওয়া কর্তব্য। ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের এমন কার্য নাই, উহার সম্বন্ধীয় এমন একটি বিশুদ্ধ মত নাই, যাহার প্রমাণ আমাদিগের শাস্ত্রে না পাওয়া যায়। ধর্ম বিষয়ে এমন একটি সদুপদেশ নাই, যাহা আমাদিগের ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায় না; সমাজ সম্বন্ধে এমন একটি সুরীতি নাই, যাহা প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল না, এবং যাহা এক্ষণে হিন্দুভাবে প্রচার না করা যাইতে পারে। হিন্দুভাব রক্ষা করিয়া আমরা ধর্ম ও সমাজসংস্কার কার্যে প্রবৃত্ত হইলে, আমরা ওই কার্যে সুসিদ্ধ হইতে পারি।’
রাজনারায়ণ খুব জোরের সঙ্গে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করছে। রাজনারায়ণের সেই প্রচারের ভাষা কি বাংলাদেশের মৌলবাদী মোল্লাদের চেয়ে সামান্য রকম আলাদা? বাংলাদেশের ধর্মীয় মোল্লারা মনে করেন তাদের ধর্মগ্রন্থে সব কিছু আছে, একই রকম দাবি করছেন রাজনারায়ণ বসু হিন্দুদের ধর্মীয়গ্রন্থ সম্পর্কে। দুপক্ষের চিন্তার মধ্যে তাহলে পার্থক্য কোথায়? রাজনারায়ণ কেন তাহলে প্রগতিশীল মানুষের তকমা পাবেন আর বাংলাদেশের মোল্লারা কেন প্রতিক্রিয়াশীল তকমা লাভ করবেন? বাংলাদেশের মোল্লাদের যদি প্রতিক্রিয়াশীল ভাবা হয়, রাজনারায়ণ কেন তবে সেই একই রকম বক্তব্য রাখার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল বলে প্রমাণিত হবেন না? তিনি বুর্জোয়া চিন্তার আলোকে আলোকিত হয়েও, ধর্ম-প্রশ্নে বাংলার মোল্লাদের চেয়ে আলাদা কিছু নন। ধর্মান্ধ হয়েও ভারতের বিরাট আলোচিত মনীষী, বহু মানুষের পরম পূজনীয়। ধরামান্ধ মহান বিবেকানন্দও ঠিক তাই।

বিবেকানন্দের পক্ষে অনেকে বলবেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করার জন্যই তিনি ভারতীয় সনাতন ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মুসলমান কট্টরপন্থীদের তাহলে দোষ কোথায়, মুসলমান কট্টরপন্থীদের বিদ্রোহ সাম্রা]জ্যবাদের বিরুদ্ধেই। প্রথম যুগে যা ভারতে ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তিতুমীর, হাজি শরীয়তউল্লাহ আর দুদুমিয়ার কৃষক আন্দোলন বা বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। বিবেকানন্দ সেরকম কোনো বিদ্রোহ করেননি ইংরেজ শাসকদের বিপক্ষে; বরং তিনি ইংরেজ শাসকদের নানাভাবে তোষণ করেছেন। তিতুমীর, হাজি শরীয়তউল্লাহ-দুদুমিয়ার ধর্মীয় আন্দোলন বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল বাংলার অপর বৃহৎ অংশ হিন্দু কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে। তিতুমীর বা শরীয়তউল্লাহ হিন্দু-কৃষকদের অস্বীকার করেননি; ফলে হিন্দু কৃষকরা মুসলমান কৃষকদেরদের সঙ্গে দুটো আন্দোলনেই যুক্ত ছিল। তিতুমীর আর শরীয়তউল্লাহ ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধতার কথা বলেছেন কিন্তু ভিন্ন ধর্মের সমালোচনা করেননি। ইতিহাসবিদ অমলেন্দু দে ‘বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন; তিতুমীর একথাও বলেন যে, কেবলমাত্র ধর্মের ব্যবধানের জন্য অ-মুসলমানদের সঙ্গে বিবাদ করা আল্লাহর পছন্দ নয় এবং দুর্বল অমুসলমানকে সাহায্য করা মুসলমানের কর্তব্য। তিতুমীর বলেন, ‘ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। যারা মুসলমান নন, তাদের সঙ্গে কেবল ধর্ম ব্যবধানের জন্য অহেতুক বিবাদ করা আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুল পছন্দ করেন না। বরং আল্লাহর প্রিয় রসুল এ কথাই ঘোষণা করেছেন, কোনো প্রবল শক্তিসম্পন্ন অমুসলমান যদি দুর্বল অমুসলমানের ন্যায়সঙ্গত দাবী অগ্রাহ্য করে তার প্রতি অন্যায় জুলুম ও অবিচার করে, মুসলমানেরা সেই দুর্বলকে সাহায্য করতে বাধ্য।’ সরফরাজপুর গ্রামের অধিকাংশ মুসলমান যখন প্ররোচিত হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয় তখন তিতুমীর ঐ গ্রামে গিয়ে জুম্মার নামাজের পরে হিন্দু-মুসলমানকে সম্বোাধন করে উপরোক্ত মন্তব্য করেন। [অমলেন্দু দে, বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ]

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিতুমীরের কাছে তাঁর রাজনীতির চেহারা পরিষ্কার। বর্তমান যুগের বিপ্লবীদের মতোই ছিল তাঁর চিন্তা চেতনা। ফলে জমিদারের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে অনেক হিন্দু তাঁর দলে যোগ দেন। বহুগুণসম্পন্ন তিতুমীর সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিহারীলাল সরকার লেখেন, ‘তিতু আপন ধর্মমত প্রচার করিতেছিল। সে ধর্মমত প্রচারে পীড়ন তাড়ন ছিল না।’ বাস্তবিক দেখা যাচ্ছে যে, তিতুমীর ধর্মসংস্কার আন্দোলন করেছেন, বিশুদ্ধ ইসলামের কথা বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজের প্রাণ দিয়েছেন-কিন্তু তিনি হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মীয় সমাজকে অস্বীকার করেননি। বরং অন্যান্য বিধর্মী ভাইদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিতুমীরে পাশে দাঁড় করালে বিবেকানন্দকে কীভাবে দেখতে পাই। তিনি ভারতের মুসলমান সমাজকে স্বীকারই করেননি। বিবেকানন্দ তাঁর অনুসারীদের বলছেন, ভারত এবং ভারতীয় ধর্মে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা স্থাপন করো। ভারতীয় ধর্ম বলতে তিনি শুধু সনাতন ধর্মকে বোঝাতে চাইছেন। ভারতে তখন ইসলাম ধর্ম সহ আরো নানা ধর্ম ছিল; বিবেকানন্দ সেগুলিকে অস্বীকার করছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ভারতীয় জাতি বলতে শুধুমাত্র হিন্দুদের কথা উচ্চারণ করেছেন। ভারতীয় মুসলমানরা যে ভারতের অংশ তাঁর আলোচনায় সে প্রসঙ্গ নেই। কিন্তু তিতুমীর তাঁর আগে জন্মে চিন্তা চেতনায় আর ধর্মীয় বিশ্বাসে যথেষ্ট প্রগতিশীল মানুষ। তিতুমীর ইংরেজি জানা বা ইংরেজি শিক্ষিত লোক ছিলেন না। তিরি ফারসি , ব্যাকরণ শাস্ত্র, আরবি ফরায়েজ শাস্ত্র, আরবি ও ফারসি কাব্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাভাষা ও অঙ্কশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। বাংলা-আরবি; ফারসি তিনটি ভাষায় তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন। ভারতে তখনো সরকারিভাবে ইংরেজিকে শিক্ষার বাহন করা হয়নি। তিতুমীর ছিলেন একজন কুশলী কুস্তিগীর। তিতুমীর যখন জন্মে ছিলেন তখনো ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ দেখা দেয়নি। ইংরেজরা তখনো সেভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াতে পারেনি কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতি আর হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থানের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলো।

রামমোহনের সঙ্কট তিনি যথেষ্ট আধুনিক হয়েও ধর্ম বর্জন করতে পারেননি বরং ধর্ম বর্জন করাকে তিনি ভ্রান্তি হিসেবে দেখেছেন। ব্রিটেনে যখন সমাজতন্ত্রী রবার্ট ওয়েনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে, তিনি ধর্মহীন সমাজতন্ত্র পছন্দ করতে পারেননি। রামমোহনই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় যার সঙ্গে ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রবাদীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটে। কিন্তু ধর্মহীন সমাজতন্ত্রকে তিনি বাতিল করে দেন। তিনি বলেন, সমাজতন্ত্রের স্বার্থরক্ষার জন্য ধর্মের সমালোচনা প্রয়োজন নেই। তিনি মনে করেন, ধর্ম মানুষের মধ্যে অনেক বেশি বদান্যতা এবং সুখ বৃদ্ধি করতে সক্ষম। ভিন্ন দিকে বিবেকানন্দ নিজেকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে দাবি করে বলেন, সমাজতন্ত্র পদ্ধতিকে তাঁর কাছে নিখুঁত বলে মনে হয়নি। বিবেকানন্দ যথেষ্ট আবেগে ভেসে গিয়ে বলেছিলেন, ভারত প্রথম ছিল ব্রাহ্মণদের শাসন, পরে ক্ষত্রিয়দের শাসন, আরো পরে বৈশ্যদের শাসন; এবার শূদ্র বা কায়িক শ্রমজীবীদের শাসনের পালা। তিনি বলেন, নিজেদের শূদ্রকর্ম বজায় রেখেই সমাজে তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তিনি বলেন ব্রাহ্মণযুগের জ্ঞান, ক্ষত্রিয়যুগের সভ্যতা, বৈশ্যের সম্প্রসারণ ক্ষমতা আর শূদ্রের সাম্যের আদর্শবজায় থাকবে। তিনি বলেন, সেই রাষ্ট্রে শূদ্রদের সাম্যের আদর্শ বজায় থাকবে কিন্তু শূদ্রদের দোষগুলি থাকবে না। শূদ্রদের দোষগুলি দূর হবে ব্রাহ্মণযুগের জ্ঞান আর ক্ষত্রিয়যুগের সভ্যতা দিয়ে। বিবেকানন্দের সকল বক্তবের সমাপ্তিতে গিয়ে সার কথা হলো, ব্রাহ্মণ্যযুগ আর ক্ষত্রিয়সভ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে; এই হলো ভারতে বিবেকানন্দের সমাজতন্ত্র।

বিবেকানন্দের এইরকম সমাজতন্ত্র চাওয়া, শূদ্রদের ক্ষমতা দখলের কথা বলা; ভারতের বিদগ্ধ সমাজের বহুজন বিনাবিচারে তাঁর এসব বক্তব্যের কারণে তাঁকে প্রগতিশীল বানাতে চেয়েছেন। কিন্তু বিবেকানন্দের এই সমাজতন্ত্র বা শূদ্রদের হাতে ক্ষমতা দেয়ার ঘোষণা ছিল তাৎক্ষনিক আবেগ। সবটাই ছিল কাল্পনিক ভাবনা; যাকে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রও বলা চলে। তিনি বর্ণপ্রথায় বিশ্বাসী পুরানো ব্রাহ্মণদের জ্ঞান দিয়ে নতুন ক্ষমতাধর শূদ্রসমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। বিবেকানন্দ স্পষ্ট করেই বলেন, উচ্চশ্রেণীরা বিলীন হয়ে যাবে। তাই তাদের কর্তব্য হলো নিজের সমাধি খনন করা। যত শীঘ্র এ কাজ তারা করবে ততই মঙ্গল। বিবেকানন্দ চান ধনীরা শূদ্রদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিক। কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন, শূদ্রজাগরণের ফলে সমাজের নৈতিক মান নেমে যেতে পারে। শূদ্রজাগরণের ফলে জনসাধারণের সুখ স্বচ্ছন্দ্য বাড়লেও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও, তার ফলে একই সঙ্গে ‘সমাজের অসাধারণ প্রতিভাশালী ব্যক্তির সংখ্যা কমে আসবে।’ তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে যেখানে ‘শূদ্র বিপ্লব ঘটেছে’ সেখানেই ‘সাংস্কৃতিক মান নেমে গেছে। ভারতে যাতে শূদ্রশাসনের এই অবস্থার সৃষ্টি না হয় সেজন্য তিনি সমগ্র দেশের উপর দিয়ে ‘একটি আধ্যাত্মিক প্লাবন’ ঘটাতে চান। বিবেকানন্দ শূদ্রের উন্নয়ন চাইলেও ব্রাহ্মণের পতন কামনা করেননি। তিনি মনে করেন, ধর্মের সারমর্ম উপলব্ধি করতে না পারার জন্যই ভারতে অস্পৃশ্যতা বিরাজ করছে। বিবেকানন্দ শেষ বিচারে ধর্ম দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করতে চান। সেটা কোন্ ধর্ম? প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম; তিনি হিন্দুত্ব বা হিন্দুধর্মকে মনে করেন মুক্তির উপায়। তিনি পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যথেষ্ট নতুন নতুন জ্ঞানগর্ভ কথা বলছেন; পুনরায় ফিরে যাচ্ছেন ধর্মের অন্ধকার যুগে। হিন্দুত্বের গৌরব তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD