বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন

পত্রগল্প – অনুভব – প্রিয়াঙ্কা নস্কর

পত্রগল্প – অনুভব – প্রিয়াঙ্কা নস্কর

পত্রগল্প - অনুভব - প্রিয়াঙ্কা নস্কর

অনুভব

প্রিয় মা,

কাল আমি ঘুম থেকে উঠেছি সকাল ন টায়।রোজ যেমন উঠি।ফ্রেশ হয়ে নীচে নামতেই,শুভেচ্ছার বন্যায় ভাসতে বেশ ভালোই লাগছিলো।শাশুড়ি মা জানালো,ফ্রেশ হয়ে নাও।মাথা নাড়িয়ে ,মিনিট কুড়ি পর টেবিলে পেলাম নিজের পছন্দের ব্রেএকফাস্ট।মনে পড়লো তোমার কথা,এভাবে তুমিও খাবার সাজিয়ে দিতে আমায় বিয়ের আগে।

স্নান সেরে নতুন কুর্তি পরে নীচে এসে দেখি,এলাহী কান্ড। বাঙালী রান্নাঘরের কোনো মেনুই বাদ পড়ে নি আজ দুপুরে।কেমন যেন হালকা অভিমান গুলো ফুরফুরে হয়ে গেলো মনের ভিতরে।মনের ঘরে বাস করা আর একটা মন বললো,আজ বিশেষ দিন বলে এতো রান্না করছে তোমার শাশুড়ি,না হলে কি করতো?

….সত্যিই কি করতো না?হিসেব করে দেখলাম,এই তিন বছরে আমি দশদিন তাদের ব্রেএকফাস্ট করে দিই নি।সকালে আমার অফিস,তারপর ন টার আগে আমি উঠতে পারি না… কি ভাবে করবো সকালের ব্রেএকফাস্ট?আচ্ছা মা বিয়ের আগেও তোমার কাছে যখন ছিলাম আমি কোনদিন ব্রেএকফাস্ট বানাই নি।তুমি বলতে,অন্যের জন্য না হোক নিজেরটা নিজে বানিয়ে নিতে শিখতে হয়।এখানে এ কথা কেউ আমার সামনে বলে নি এখনো।বলতে চায় হয়তো কিন্তু বলে নি।

রাতে অফিসের পর বাড়ি ফিরে সোজা ডিনার টেবিলে বসে যাই।জানি আমার খাবার রেডি থাকবে।কি ভাবে রেডি থাকবে তা জানার চেষ্টা করি নি।শুধু শাশুড়ি মা কে বলেছিলাম,আমি কবে কি খাবো তার সাপ্তাহিক লিস্ট করে ফ্রিজের গায়ে চিপকে দিয়েছি।কাজের দিদি যেন ওভাবেই করে রাখে।

তাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে উনি।ওনার মনের ভিতর কি ভাবনারা বয়ে চলে আমি বুঝতে পারি নি।মুখ ফুটে কিছুই বলে না।যাইহোক,ওনারা এখন রাতের খাবার খাবে না,সিরিয়াল দেখে।আমি তাই একাই খেয়ে নি।

ওদের সাথে ওতো রাতে খেলে আমার ডায়েটে প্রবলেম হয়ে যাবে।অরিন ও তখন ফেরে না।তাই শাশুড়ি মা খাবে না।অরিন ফিরলে ওরা তিনজন একসাথে খায়।

আমি কখনো সার্ভ করি,কখনো নয়।গ্রীন টি নিয়ে ব্যালকনির দোলনাতে বসে তোমার সাথে কথা বলি।ওরা নীচে তখন টেবিলে কত কথা বলে,হাসে।হিসেব করে দেখলাম,তোমার সাথে ফোনে আমার যা কথা হয় নীচের তলার শাশুড়ি মায়ের সাথে তার এক ভাগও কথা হয় না।

কি ভাবে হবে,সকালে বেরিয়ে যাই আর রাতে ফিরি!আমার চাকরির টাকায় এ বাড়ির কুশন কভার ও কেনা হয় নি কখনো।আমি তো সাজানো বাড়িতেই এসেছি,তাই কিছু লাগে না এখানে।কিন্তু আমি আজও জলপাইগুড়ির।বাড়ির সব ঘরে কি কি হবে কোথায় কি থাকবে,তার খোঁজ রাখি।

হাঁ… শখ করে পূজায় একটা শাড়ি দি শাশুড়ি মা কে।না বললেও শাশুড়ি মা বুঝতে পারে,ওটা আমি দিয়েছি।তাই মনে রেখে কোন না কোনো সময়ে বলে,তোমার দেয়া শাড়ি টা খুব সুন্দর হয়েছে।আমার ভালো লেগেছে ওনার কথা শুনে।

কিন্তু,আমি কোনদিন ওনাকে বলি নি,তুমিও আমার মায়ের মত সুন্দর পায়েস বানাও আমার জন্মদিনে।আমি খেয়েছি ওনার হাতের পায়েস,মায়ের মতোই হয় কিন্তু বলি নি।বলেছি,আমার মা আরো কত কিছু করতো আমার জন্মদিনে।শাশুড়ি মা শুনেছে নীরবে সে কথা কিন্তু বলে নি কিছু মুখে।

জানো মা,যেদিন আমার প্লেটে লেগ পিস পড়তো না, তখন অভিমানে ভাবতাম,আমার মা হলে এমন করতেই পারতো না।নিজের ছেলেকে দিয়েছে আর আমি তো পরের বাড়ির মেয়ে।আচ্ছা মা দুটো লীগ পিস ,কখনো আমাকে আর অরিন কে,কখনো অরিন আর শ্বশুর কে বা কখোনো আমাকে আর শ্বশুরকে দিয়েছে।

নিজের প্লেটে কখনো নেয় নি। বিয়ের আগে আমি যে একাই ছিলাম তোমার কাছে তাই সব সময় আমি লেগ পিস পেয়েছি,কিন্তু এখানে তো অরিন ও আছে কি ভাবে ভাগ করবেন উনি?সেদিন ভাবি নি এ কথা।

নিজেও চাকরি করতেন প্রাইমারি স্কুলে।তাই নিজের আসুবিধা গুলো আমার মধ্যে হবে তিনি বুঝতে পারতেন আগে থেকেই।সে জন্য সকালে অরিন যখন আমার থেকে আগে অফিসে বেরিয়ে যায়,উনি অরিনের ব্রেএকফাস্ট রেডি করেন।

কাজের দিদি ন টার আগে আসে না যে!চা খেয়ে ছেলে অফিসে বেরিয়ে যাবে সেটা তার মানসিক প্রবলেম ,আমার নয়।অফিস ক্যান্টিন আছে,সেখানে খেয়ে নেবে।তোমার মায়ের এসব বাড়াবাড়ি…বলেছিলাম অরিন কে।অরিন বলেছিলো, তোমার তো বানাতে হচ্ছে না।তাহলে কি অসুবিধা?রাগ হয়েছিল অরিনের উপর।

আত্মীয়দের কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে,তিন বছর হয়ে গেল বাচ্ছা কবে নেবে?…আমার উত্তরের আগেই শাশুড়ি মা বলেছে, সময় হলেই নেবে।কিন্তু আমি শাশুড়িকে জানায় নি,আমার অসুবিধা আছে।স্বাভাবিক ভাবে বাচ্ছা হচ্ছে না।

তাই দুবার I U I করেও যখন হলো না,তখন IVF এর কথা ভাবছি।কিন্তু এ বাড়ির কেউ জানে না সে কথা।আমিই বলতে বারণ করেছি,অরিন মেনে নিয়েছে আমার কথা।

উপরের তলার প্রতিটা কোন আমার পছন্দে সাজানো।উনি কোনদিন বলে নি এটা এখানে নয় ওখানে রাখো।বলেছেন,বাহ তোমার পছন্দ বেশ ভালো তো!বলে নি ওই ঘর সাজানো জিনিস নীচের তলায় লাগবে।এমন অনেক ঘটনা আছে মা জানো।কিন্তু আমি জেনেও না জানার মতো ছিলাম।দেখেও এড়িয়ে গেছি।

আজ সকালে,প্যানক্রিয়াশের যন্ত্রনায় হসপিটালে ভর্তি হয়েছে অরিনের মা।আমি ও নামেই বেশি কম্ফোর্টেবল ছিলাম বাইরের কাউকে কিছু বলার ক্ষেত্রে।মা ডাক, নিজের মাকে ছাড়া আর কাউকে বলবো না,এটাই আমার ধারণা।

নিজের মায়ের মতন কেউ আবার হয় নাকি?….না নিজের মায়ের মতো কেউ হয় না ঠিক।আবার আমিও তো তার নিজের সন্তানের মতো হতে পেরেছি কি? মনে পড়ে,বিয়ের পর আপনি আপনি করতাম বলে,একদিন বললো…তুমি নিজের মাকে বাবাকে আপনি বলো না।তখন আমাদের কেও তুমি করেই বলবে।কিন্তু আমি পারি নি।

সেই আপনিই বেরিয়ে আসে।মা,তোমার সাথে তো আমার রক্তের সম্পর্ক।তাই তুমি আমার এতো কাছের।অরিনের সাথে আমার সামাজিক সম্পর্ক,তাকে যদি আপন করে নিতে পারি তাহলে তার বাবা মা কে তেমন করে কেন আপন করতে পারি নি?

উনি এক দিন হসপিটালে ভর্তি আছেন ,পুরো বাড়ি যেন ফাঁকা হয়ে গেছে।কোন কিছুই সময়ে হচ্ছে না।কাজের দিদি কি রান্না করবে ?আমি বলতে পারি নি আজ।একটা মানুষের অস্তিত্ব যেন গোটা বাড়িতে।পুরো বাড়িটাই যে উনি আগলে রেখেছেন।

আমি ওনাদের পছন্দ করি,কিন্তু নিজের করে নিতে পারি নি এই তিন বছরে।কেন?আজ নিজেকে প্রশ্ন করলাম।উত্তর পেলাম না …কিছুই।তুমি যখন এ বাড়িতে আস্তে,আমি দেখেছি তোমার সাথে অরিনের মায়ের কি গল্প আর বাবার সাথে অরিনের বাবা দাবা খেলা থেকে উঠতেই চাইতো না।

অরিনের সাথেও তোমাদের কি মিল।তোমাদের কিছু হয়েছে শুনলেই, অরিন জলপাইগুড়ি ছুটে যায়।কিন্তু আমি অনেক সময় জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যাই ওনার সুগার কেমন আছে?

আজও আমি রাতে দোলনায় বসে আছি।ভাবছি,এ বাড়িতে এসেছিলাম অনেক প্রত্যাশা নিয়ে।সে প্রত্যাশার কিছু পূরণ হয়েছে কিছু হয়নি।মনের মধ্যে সেই পূরণ না হওয়া প্রত্যাশাই কি দুরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে?কিন্তু আমাকে ঘিরেও এ বাড়ির কিছু প্রত্যাশা ছিলো।

সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কিনা খোঁজ রাখি নি।দায়িত্ত্ব নামের বেড়াজালে নিজেকে বাঁধতে চাই নি কখনোই।ভেবেছি,আমি কোনো কিছুতেই কম নয়।রূপে,শিক্ষায়,রুচিতে,আবার কি চাই?অসুবিধা হলে ফ্ল্যাট কিনে বেরিয়ে যাবো।

আজ ওনার অনুপস্থিতি আমাকে জানালো,ভাঙা খুব সোজা।গড়তে পারাটাই যে শক্ত।এ বাড়ি,এ সংসারের খুঁটিনাটি ,আত্মীয় স্বজন সবকিছু এতদিন উনি সামলে এসেছেন।কি ভাবে?ভালোবাসা- আর দায়িত্ত্ব দিয়ে।আমি আজ সত্যি চাই মা,এভাবেই এ বাড়িটাকে বেঁধে রাখতে।আচ্ছা মা,আমার যদি ছেলে হয় তার ও একদিন বিয়ে হবে।তখন?আর মেয়ে হলে তো,চিন্তাই নেই।মেয়েরা কিন্তু বেশি বাবা মায়ের কথা ভাবে আজকালকার দিনে।

খবরের কাগজে,টিভির পর্দায় অথবা চলমান মুঠোফোনে অনেক খবর দেখি শুনি,শাশুড়িরা বৌমাদের এই করেছে।ওই করেছে।মেয়েদের জন্য আইন হয়েছে অনেক বেশি।আচ্ছা মা,এমন খবর তো আছে কত বৌমার হাতে বৃদ্ধ শাশুড়ি মানসিক ভাবে নির্যাতিত!

আসলে কি জানো মা,তোমাদের মত করে এদের ভালোবাসতে পারি নি।ফাঁক যে সেখানেই।একটু ভালোবাসলে সব সম্পর্কই সুন্দর হয়।

এবার থেকে তোমার সাথে একটু কম কথা বলে রাতের খাবার টেবিলে ওদের সাথে বসেই গ্রীন টি টা খাবো।কেমন?ওই গল্পে ওই হাসিতে আমিও ভাগ নিতে চাই।অরিনের মা,নাহ এ বাড়ির মা হসপিটাল থেকে আসলেই,সেটা করবো।তুমি ভালো থেকো মা।

©️প্রিয়াংকা নস্কর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD