শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন

দেওয়ান মিজানঃ তার সৃজন – আহসান হাবিব

দেওয়ান মিজানঃ তার সৃজন – আহসান হাবিব

দেওয়ান মিজান, প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাওয়া একজন অসাধারণ চিত্রকর। মাস ছয়েক আগে একদিন আমার বন্ধু সজল বললো দেওয়ান মিজান স্যার আপনাকে দেখতে চেয়েছেন। আমি অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে আমার মত একজন নগন্য মানুষকে কেউ দেখতে চায়!

গিয়েছিলাম তার বাসায়। একটি চমৎকার দুপুর কাটিয়েছিলাম তার সঙ্গে। সেদিন তিনি আমাকে তার লেখা একটি বই ‘অভিন্ন ভ্রূণে কবিতা ও চিত্রকলা’ উপহার দিয়েছিলেন। আমি দিয়েছিলাম আমার লেখা একটি উপন্যাস- হোমো স্যাপিয়েন্স।

আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশ হারালো একজন প্রতিভাদীপ্ত চিত্রকর এবং মানুষ। আমি তার বইটি পড়ে একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছিলাম। আজ সেটি প্রকাশ করে তার প্রতি আমি শোক এবং শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

—–

অভিন্ন ভ্রুণে কবিতা ও চিত্রকলা: দেওয়ান মিজান
*

অনেকদিন পর একটি সম্পূর্ণ বই পড়লাম। বলা যায় পড়তে বাধ্য হলাম।

কেন বাধ্য হলাম?

কারণ প্রথমত বইটি শিল্প বিষয়ক, নন্দনতাত্ত্বিক, আমার প্রিয় বিষয়। দ্বিতীয়ত বইটি পড়তে শুরু করার সংগে সংগে আমার চিন্তাকে ট্রিগার করেছে। বইটির আলোচ্য বিষয় হচ্ছে কবিতা এবং চিত্রকলার সৃজনলীলা কিভাবে ভ্রূণাকারে তৈরি হয় এবং তা একজন কবির হাতে কবিতা হয়ে ওঠে এবং একজন চিত্রকরের হাতে ছবি হয়ে ওঠে।

একজনের হাতে ধ্বনি, শব্দমালা, একজনের হাতে রং।

বস্তুজগতের সংস্পর্শে এসে তাদের উভয়ের চেতনা ভিন্ন হয়ে পড়ে। এই ভিন্নতা মানসিক গঠন, তার উৎকর্ষ এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল বলে তাদের উভয়ের প্রকাশ আলাদা হয়ে যায়। হয়তো দুজনেই একটি রঙধনু দেখেছেন কিন্তু রংধনু বিষয়ক যে চিন্তা তাদের ভেতরে একটি ভাবের জন্ম দিয়েছে, সেই ভাব প্রকাশ আলাদা মাধ্যমে বাঙময় হয়ে উঠেছে এবং তাদের চিন্তার ভিন্নতা ধরা দিয়েছে।

বস্তু থেকে একজন কবি কিংবা চিত্রকর যা প্রাপ্ত হন, তা কেবলি তার বস্তুরূপ এবং সেও তাৎক্ষণিক। কেননা, বস্তু সতত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীলতায় যা ভূমিকা রাখে তা হলো আলো। আলো আর কিছুই নয়, তরঙ্গ। তরঙ্গ মানেই গতিশীল। এই গতিই বস্তুকে বদলে বদলে দেয়। ফলে একই বস্তু ভিন্ন স্থানে দুরকম হয়ে দেখা দেয়। দেখা এবং তার উপর মানসিক চেতনার সৃষ্টি শুধু মাধ্যমের ভিন্নতার জন্য আলাদা হয় না, হয় চেতনার পার্থক্যের কারণে।

কবি কিংবা চিত্রকর বস্তুরূপকে কিভাবে শিল্পরূপে রূপান্তর করেন, তা তাদের বোধ এবং ব্যবহারের কুশলতার উপর নির্ভর করে। এটি পরবর্তী অধ্যায়। এই অধ্যায়টিই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বস্তু কি করে শিল্পে রূপান্তরিত হয়, সেখানেই রয়েছে শিল্পী বা কবি হয়ে ওঠার চাবিকাঠি।

সৃজিত বস্তুতে হয়তো দেখা গেলো দেখা বস্তুটির কোন অস্তিত্ব নেই কিংবা থাকলেও আছে কেবল আভাসমাত্র। তাতে শিল্পবস্তুটি মিথ্যা হয়ে যায় না, বরং রূপান্তরিত হয়। এটাকেই লেখক আপেক্ষিক মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই যে আপেক্ষিক মিথ্যা নির্মাণ- এটাই শিল্প। ইন্দ্রিয়চেতনা কিভাবে কাজ করে, তা বুঝতে পারলে এই রূপান্তরটি বোঝা যায়। যেমন আমরা যদি একটা ফুলের সুবাস নিই, তাহলে কখনো ঐ ফুলের কোন বস্তুর মধ্যে কোন সুবাস খুঁজে পাবো না, পাবো তার অনু পরমাণু। কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয় ঠিক ঠিক সুবাস পাবে। এই যে ইন্দ্রিয়ানুভূতি, এটা অধরা অথচ তা বস্তুগত। ইন্দ্রিয় নিজেই একটি বস্তু, বিশেষ বস্তু যা ফুলের সুবাস শনাক্ত করতে সক্ষম। কবিতা কিংবা চিত্র সেই অধরা সুবাস যা তার উপাদানে নেই মানে ধ্বনি কিংবা রঙে নেই, আছে তাদের থেকে বিচ্ছুরিত বিন্যাসে, ছন্দে।

প্রকৃতির সব বস্তুই যেহেতে গতিশীল, তাই এর প্রধান ধ্বনি হচ্ছে সুর। সুর হচ্ছে সংগীতের প্রাণ। আমরা যখন স্বরের বিন্যাসে সুর শুনি, তখন আলাদা করে স্বরের মধ্যে এই সুর থাকে না, থাকে এর বিন্যাসে, গতিময়তায়, ছন্দে যা আমাদের ইন্দ্রিয় অনুভব করে। কবিতা এবং চিত্রের অন্বিষ্ট এই সুরকে ধরা। সুর অধরা, তাই কবিতা, চিত্রকলা কিংবা যে কোন শিল্পই অধরা।

পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো এই গ্রন্থ নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় বাংলা ভাষায় একটি অনন্য সংযোজন। এই গ্রন্থ পাঠ করা এক অনুপম আনন্দ। বিষয়ের ব্যাখায় যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তা অনন্য উচ্চতার।

বইটি নন্দনতত্ত্বের যে কোন ছাত্রের জন্য অবশ্য পাঠ্য বলে আমার মনে হয়েছে।

গ্রন্থের লেখক দেওয়ান মিজান একজন নিজেই অসাধারণ চিত্রকর। ফলে বিষয়টির উন্মোচন হয়েছে অসাধারণ গভীরতায়।

দেওয়ান মিজান, আমার অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।

*

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD