শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন

জন্মদিনে জেনারেল ওসমানীকে স্মরণ

জন্মদিনে জেনারেল ওসমানীকে স্মরণ

আজ মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি
জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৩ তম জন্মদিন।
বাংলাদেশের তথা ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বিরল মেধাবী বাঙালি সেনা,সিলেটের কৃতি সন্তান সর্বজন প্রিয় মরহুম এম এ জি ওসমানীর ১০৩ জন্মদিনে তাঁকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের এ দিনে সিলেটে জন্ম নেন।

এ ব্যক্তিত্ব ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট গভর্নমেন্ট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হন! এজন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রাইওটোরিয়া সম্মানে ভূষিত করেন।
তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে গ্রাজুয়েশন নেন।

এরপর ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হন এবং ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ছিলেন সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে অবসর নেন কর্ণেল হিসাবে।চিরবৈষম্যের এক জলন্ত নজির ছিল তা।পাকিস্তানি সরকার বাঙালি সেনানায়ক হিসাবে বৈষম্য করে তাকে বার বার প্রমোশন আটকে রাখে ও যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি।দিলে তিনি আইয়ুবের জায়গায় ফিল্ড মার্শাল ও পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি হতেন।
অতঃপর ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামীলীগের পক্ষে সুনামগঞ্জ-বালাগঞ্জ,বিশ্বনাথ আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাংসদ নির্বাচিত হন।


এরপর যুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিবাহীনির সর্বাধিনায়ক হন।তাঁকে জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রদান নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭১ খৃষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে প্রথমে চার,তারপর সাত ও আরো পরে এগারটি সেক্টরে বিভক্ত করেন।জেনারেল ওসমানীকে

জেনারেল জিয়াউর রহমানের নানা ষড়যন্ত্রের কারণে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি জিয়াকে কোর্ট মার্শাল করে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তাজউদ্দীনের বাধার মুখে জিয়ার বিচার করতে না পারলেও তাকে মুক্তিযুদ্ধকালে নিস্ক্রিয় করে ত্রিপুরায় নজরবন্দী রাখেন এবং জেড ফোর্স ভেঙে দেন।পরে মিত্রবাহিনী গঠিত হলে তাদের সঙ্গে কুচক্রী জিয়াকে সিলেট রণাঙ্গনে পাঠান।

১৫ ডিসেম্বর সিলেট রণাঙ্গন পরিদর্শন কালে তার হেলিকপ্টার ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি পলাতক সেনাদের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। যুদ্ধশেষে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন তিনি।এরপর তাকে নৌপরিবহন, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আবার একই আসন থেকে ৯৪% ভোটে নির্বাচিত হয়ে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে পার্লামেন্টারিয়ান পদ্ধতি বনাম প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি বিতর্কে তিনি পদত্যাগ করে। তিনি ছিলেন সংসদীয় পদ্ধতিতে বিশ্বাসী এবং আজীবনের সাধক।এ কারণে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল (সবদল বিলুপ্ত করে একদল কায়েম করার অপপ্রচার) প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদ করেন।এর জের ধরে সংসদ এবং আওয়ামীলীগ হতে পদত্যাগ করেন তিনি।

১৫ আগস্ট জাতির পিতা নিহত ও কুচক্রী মোশতাক ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশে ভারতের আক্রমণ সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং খুনি রশিদ ফারুক চক্র বঙ্গভবনে নিয়মিত আড্ডা বসালে তিনি তাঁর বিবেচনায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মোশতাকের সরকারকে সহযোগিতা করে রাজনৈতিক ভুল করেন।এ ভুলের জন্য এ ত্যাগী সামরিক নেতা ও সংসদীয় রাজনীতির সেবক জেনারেল ওসমানী আজ প্রায় নির্বাসিত।


একই বছর ৩৯ শে আগস্ট খন্দকার মশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নিযুক্ত হন কিন্তুু ৩রা নভেম্বরের জেলহত্যাকান্ডের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।তিনি ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নিজেই ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন।১৯৭৮ এবং ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করেন।খুনি মোশতাক ও জিয়া ও পরে এরশাদকে পৃষ্টপোষকতা দেয়া এবং জিয়ার দ্বারা পাঠ্য বইয়ে তাকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক পদের উল্লেখ থাকার প্রতিবাদ না করাও তাঁর মানবিক ভুল ছিল।

মূলত তিনি ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।এগুলো জিয়া ইচ্ছে করেই করেছিল।প্রথমে তাঁর পার্লামেটারিয়ান থাকার চেষ্টা, বাকশাল থেকে পদত্যাগ,খুনি মোশতাক, জিয়া ও এরশাদকে পৃষ্ঠপোষক্তা দেয়া প্রভৃতি কারণে তিনি আজ উপেক্ষিত বলা যায়।এর পেছনে ভারত বাংলাদেশকে আক্রমণ করতে পারে এমন ভয়ও ছিল।অনেকেই এসব কারণ না জেনে হতাশ হন।তারা জানেন না ওসমানীর মানুষ হিসাবে কি কি ভুল ছিল।

ওসমানীর পরিস্থিতিজনিত ভুলগুলো আজ তাঁকে কতটা পিছিয়ে দিয়েছে তা আমরা দেখছি ইতিহাসের শিক্ষাও তাই। অবশেষে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই কীর্তিমান পুরুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে মৃত্যুবরন করেন।
-হাসনাইন সাজ্জাদী

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD