রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন

অবিস্মরণীয় হেমিংওয়ে – আহমেদ জহুর

অবিস্মরণীয় হেমিংওয়ে – আহমেদ জহুর

অবিস্মরণীয় হেমিংওয়ে
আহমেদ জহুর

নোবেলজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ওল্ডম্যান এন্ড দ্য সী’। এর লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্মরণীয় উক্তি, ‘পালিয়ে বাঁচা যায় না। বাঁচতে হলে লড়াই করতে হয়।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জীবন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের মাথায় গুলি করে জীবনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। এই কালজয়ী লেখকের আজ ৬০তম মৃত্যুবার্ষিকী! তিনি ১৯৬১ সালের ০২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সাহিত্যে নোবেলজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ছিলেন একজন মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। তাঁর আইসবার্গ তত্ত্ব নামে পরিচিত নির্মেদ ও নিরাবেগী লেখনী বিংশ শতাব্দীর কথা-সাহিত্যের ভাষা শৈলীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে তাঁর রোমাঞ্চপ্রিয় জীবন ও ভাবমূর্তি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁকে ব্যাপক প্রশংসিত করে তোলে। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে তিনি তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচনা করেন এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোটগল্প সংকলন এবং দুইটি অকল্পিত সাহিত্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আরও তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোটগল্প সংকলন এবং তিনটি অকল্পিত সাহিত্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো মার্কিন সাহিত্যের ধ্রুপদী বা চিরায়ত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।হেমিংওয়ে

পুরোনাম আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। ১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ক্লেরেন্স এডমন্ডস হেমিংওয়ে চিকিৎসক এবং মাতা গ্রেস হল হেমিংওয়ে একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা দুজনেই ওক পার্কে উচ্চ শিক্ষিত ও সম্মানিত ছিলেন। হেমিংওয়ে ওক পার্ক এলাকায় বেড়ে ওঠেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি কয়েক মাস দ্য ক্যানসাস সিটি স্টার সংবাদপত্রে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং ইতালীয় রণাঙ্গনে গমন করেন। ১৯১৮ সালে মারাত্মক আঘাত পান এবং বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতাই অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯) উপন্যাসের মূল অনুপ্রেরণা।

হেমিংওয়ে ১৯২১ সালে হ্যাডলি রিচার্ডসনকে বিয়ে করেন এবং প্যারিস চলে যান। সেখানে তিনি বিদেশি প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন এবং ‘হারানো প্রজন্ম’ নামে আধুনিক লেখক-শিল্পীদের প্রবাসী সম্প্রদায় দ্বারা প্রভাবিত হন। তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য সান অলসো রাইজেস ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে হ্যাডলির সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয় এবং তিনি সাংবাদিক পলিন ফাইফারকে বিয়ে করেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর ফাইফারের সাথেও তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ফর হুম দ্য বেল টোলস (১৯৪০) উপন্যাস রচনা করেন। ১৯৪০ সালে তিনি মার্থা গেলহর্নকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে ম্যারি ওয়েলসের সাথে তাঁর সাক্ষাতের পর গেলহর্নের সাথেও তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তিনি নরম্যান্ডি অবতরণ ও প্যারিসের স্বাধীনতার সময় উপস্থিত ছিলেন।

দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী প্রকাশের কিছুদিন পর আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আফ্রিকায় সাফারি ভ্রমণে যান। সেখানে তিনি পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পান, কিন্তু বাকি জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি শারীরিক পীড়া নিয়ে কাটান। ১৯৩০-এর দশকে ফ্লোরিডার কি ওয়েস্টে এবং ১৯৪০ ও ১৯৫০ এর দশকে কিউবায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৯৫৯ সালে আইডাহোর কেচামে একটি বাড়ি ক্রয় করেন এবং সেখানে ১৯৬১ সালের ০২ জুলাই তিনি মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ রচনা করেন ১৯৫১ সালে কিউবায় অবস্থাকালে এবং ১৯৫২ সালে তা প্রকাশিত হয়। এটা তাঁর সেরা লেখাগুলোর অন্যতম। উপন্যাসের প্রধান কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উপসাগরীয় স্রোতে বিশাল এক মারলিন মাছের সাথে সান্তিয়াগোর এক বৃদ্ধজেলের সংগ্রাম নিয়ে। ১৯৫৩ সালে দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী সাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার এবং ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করে। তিনি নোবেল পুরস্কারের সমুদয় অর্থ কিউবার দাতব্য সংস্থায় দান করে দেন। ১৯৮৬ সালে তাঁর পদকটি হারিয়ে যায় কিন্তু কিউবার অষ্টাদশ রাষ্ট্রপতি রাউল কাস্ত্রোর তীব্র অসন্তোষের পরে সেই পদকটি তাঁকে ফিরিয়ে দেয়া।

তিনি উপন্যাসটি লিখেছিলেন জীবনের শেষের দিকে। প্রথমে দিকে উপন্যাসটি ছাপা হয়েছিল পঞ্চাশ হাজারের মত কপি। পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে উপন্যাসটি। আর সে কারণেই উপন্যাসের বিভিন্ন বর্ণনা আর ঘটনা নিয়ে পাঠকদের মধ্যে আলোচনার অন্ত নেই। অনেকে বলেছেন বুড়ো সান্তিয়াগো এই গল্পের নায়ক। আবার অনেকে বলেছেন সমুদ্রই এই গল্পের নায়ক। এই সমুদ্র সম্ভবত সকল প্রাণীর শিক্ষক। বুড়ো সান্তিয়াগো তারই ছাত্র।

এই উপন্যাসের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া বুড়ো সান্তিয়াগোর সংগ্রামী কাহিনীর সাথে সাথে সমুদ্রের সূক্ষ্ম বর্ণনা পাঠককে আকৃষ্ট করে দারুণভাবে। সমুদ্রের পানি কেটে বেরিয়ে যাওয়া উডুক্কু মাছ। তলা থেকে বেরিয়ে আসা নানা জাতের হাঙর। হাঙরের বিভিন্ন শারীরিক কসরত। পড়তে গেলে বিভিন্ন ঘটনা এতই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে যে, লেখক নিজেই বইটি সম্পর্কে বলেছেন, আনকোরা পাঠকের জন্য এটি অন্যরকম ব্যাপার।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- দ্য টরেন্টস অব স্প্রিং (১৯২৬), দ্য সান অলসো রাইজেস (১৯২৬), আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯), টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট (১৯৩৭), ফর হুম দ্য বেল টোলস (১৯৪০), অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ (১৯৫০), দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী (১৯৫২)।

© আহমেদ জহুর
কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

 

#তথ্যসূত্র :

০১। ‘Star style and rules for writing’.
দ্য ক্যানসাস সিটি স্টার। ২৬ জুন, ১৯৯৯।
০২। পুটন্যাম, টমাস (১৫ আগস্ট ২০১৬)।
‘Hemingway on War and Its Aftermath’.
National Archives. ২১ জুলাই ২০১৮।
০৩। গার্নার, ডোয়াইট (২৪ জুন ২০১৪)। ‘Daunting
Path to Publication. দ্য নিউইয়র্ক টাইমস.
০৪। গিলরি, হ্যারি (২৩ আগস্ট ১৯৬৬)। “Widow
Believes Hemingway Committed Suicide;
She Tells of His Depression and His
‘Breakdown’ Assails Hotchner Book”.
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। ২২ জুলাই ২০১৮।
০৫। উইলসন, স্কট। Resting Places: The Burial
Sites of More Than 14,000 Famous
Persons (৩য় সংস্করণ)। ম্যাকফারল্যান্ড
কোম্পানি ইনকরপোরেটেড পাবলিশার্স।
০৬। ‘The Sun Also Rises: Marital Tragedy.
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। ৩১ অক্টোবর ১৯২৬।
০৭। ‘The Nobel Prize in Literature 1954’.
নোবেল পুরস্কার। দ্য নোবেল ফাউন্ডেশন।
২৪ জুলাই ২০১৮।
০৮। হ্যালেনগ্রেন, অ্যান্ডার্স (২৮ আগস্ট ২০০১)।
‘Article about Ernest Hemingway: A Case
of Identity: Ernest Hemingway’.
নোবেল পুরস্কার। ২৪ জুলাই ২০১৮।
০৯। হফম্যান, জ্যান (১৫ জুন ১৯৯৯)। ‘A Line of
Hemingway Furniture, With a Veneer of
Taste’. দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ২৫ জুলাই ২০১৮।
১০। স্মিথ, জ্যাক (১৫ মার্চ ১৯৯৩)। ‘Wanted: One
Really Good Page of Really Bad
Hemingway”। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস।
২৫ জুলাই ২০১৮।
১১। রেইনি, জেমস (২১ আগস্ট ১৯৯৬)। ‘Margaux
Hemingway’s Death Ruled a Suicide’.
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস। ১৯ জুন ২০১৯।
১২। ‘Coroner Says Death of Actress Was
Suicide’. দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
২১ আগস্ট ১৯৯৬।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD