শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর জীবন শুরু থেকে শেষ, বৈশিষ্ট্য ছিল এক – মোহাম্মদ আব্দুল মালিক

বঙ্গবন্ধুর জীবন শুরু থেকে শেষ, বৈশিষ্ট্য ছিল এক – মোহাম্মদ আব্দুল মালিক

বঙ্গবন্ধুর জীবনের শুরু থেকে শেষ, বৈশিষ্ঠ্য ছিলো এক
মো: আব্দুল মালিক

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, হালের বিশ^বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জনদরদী, পরোপকারী, সত্যবাদী, বন্ধুবৎসল ও আমৃত্যু অকুতোভয় একজন জাতীয়তাবাদী নেতা, একজন বীর বাঙালি। তাঁর জীবনের এই বৈশিষ্ঠের প্রকাশ ঘটে একেবারে শৈশবে, অব্যাহত থাকে আমৃত্যু। এই মহান নেতার এ গুণ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করছি।

১৯৩৮ সাল। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ আসবেন। তাঁদেরকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এনিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে আড়াআড়ি চলছিল। কারণ শেরেবাংলা মুসলিম লীগের সাথে মিলে মন্ত্রী সভা গঠন করেছেন। এ সময় দু’একজন মুসলমানের উপর অত্যাচারও হয়। আব্দুল মালেক নামে বঙ্গবন্ধুর এক সহপাঠী ছিল। তাকে ‘হিন্দু মহাসভা’র সভাপতি সুরেন ব্যানার্জীর বাড়িতে ধরে নিয়ে আটকে রেখে মারধর করা হচ্ছে। খন্দকার শামছুল হক ওরফে বাসু মিয়া মুক্তার সাহেবের নিকট থেকে খবর পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকজন ছাত্র নিয়ে সেখানে হাজির হন। তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। শেখ মুজিবকে দেখে রমাপদ নামে একজন ভদ্রলোক তাঁকে গালি দেন। তিনিও তার প্রতিবাদ করেন। রমাপদ থানায় খবর দিলে তিনজন পুলিশ এসে হাজির হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেও শেখ মুজিব তাঁর সহপাঠী আব্দুল মালেককে ছেড়ে দিতে চাপ দেন। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল মারপিট হয়। তিনি দরজা ভেঙ্গে আব্দুল মালেককে কেড়ে নিয়ে আসেন। এ ঘটনায় হিন্দু নেতারা থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য, “সকাল ন’টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরো অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কী করে আসবে-থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল। প্রায় দশটার সময় টাউন হল মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হলো আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাত ভাই মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করত, সে আমাকে বলে, মিয়া ভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাও না।’ বললাম, ‘যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।

এই সময় আব্বা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। দারোগা সাহেবও তাঁর পিছে পিছে বাড়িতে ঢুকে পড়েছেন। আব্বার কাছে বসে আস্তে আস্তে সকল কথা বললেন। আমার গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখালেন। আব্বা বললেন, ‘নিয়ে যান’। দারোগা বাবু বললেন, ‘ও খেয়েদেয়ে আসুক, আমি একজন সিপাহি রেখে যেতেছি, এগারোটার মধ্যে যেন থানায় পৌঁছে যায়। কারণ, দেরি হলে জামিন পেতে অসুবিধা হবে’। আব্বা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মারামারি করেছ?’ আমি চুপ করে থাকলাম, যার অর্থ ‘করেছি’। অসমাপ্ত আত্মজীবনী- দি ইউনিভাসিটি প্রেস লিঃ, প্রথম প্রকাশ ২০১২, পৃষ্ঠা: ১১,১২ ও ১৩। তখন তিনি মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, বয়স ১৭/১৮ বছর। সেই কিশোর বয়সেও বঙ্গবন্ধু কতটা বন্ধুবৎসল, জনদরদী, পরোপকারী, সত্যবাদী ও সাহসি ছিলেন এই ঘটনা তার প্রামণ।

এই ঘঠনার পরে বঙ্গবন্ধুর জীবনে এ রকম আরও বহু ঘটনা আছে। আসলেই তাঁর পুরো জীবনটাই ছিলো এরকম। তাঁর জীবানের শেষ ঘটনাটি এখানে তুলে ধরছি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ কালোরাত। যে রাতে মীরজাফরের উত্তরাধিকারী, স্বাধীনতার পরাজিত শত্রæ ও আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্রের নীল নকশা অনুযায়ি কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্য তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর বাড়িতে আক্রমণ করে। সেদিন সেনাপ্রধান কে.এম শফিউল্লাকে ফোন করে তিনি শান্ত ও সাবলীল কণ্ঠে বলেন, “শফিউল্লা তোমার বাহিনী আমার বাড়ি আক্রমণ করেছে, কামালকে বোধহয় মেরে ফেলেছে, তুমি দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণ কর।” তারপর তিনি তাঁর শখের পাইপ হাতে নিয়ে শয়ন কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দেখেন, তাঁর কাজের ছেলে ‘আব্দুল’ গুলিবিদ্ধ। তিনি বীরের মতো গর্জন করে বলেন, ‘ও আমার কাজের ছেলে, ওকে কেন গুলি করা হয়েছে ? “তোরা কে, কি চাস ? ” তখন সামনে থাকা সৈনিকটি ভড়কে একপাশে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পিছনে থাকা ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। গুলি বঙ্গবন্ধুর বুকে লাগে, তিনি সিঁড়ির উপর লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই শাহাদাত বরণ করেন। সেই ঘটনা ও ছবি সাক্ষ্য দেয় মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও তিনি ছিলেন বীরের মতো অকুতোভয়, অবিচল। প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালানোর চেষ্টা না করে, বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বা পরিবারের কথা চিন্তা না করে কাজের ছেলে আব্দুলের চিন্তা করছেন। আজীবনের অভ্যাস মতো সাহসিকতার সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, অধীনস্তদের শাসন করছেন, খোঁজ নিচ্ছেন। পবিত্র হাদীস শরীফে আছে, “যখন শত্রæর সম্মুখীন হইবে তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিও না।” বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু এই সত্য লালন করেছেন।

জন্মিলে মরিতে হবে, এ বিধির বিধান। তবে সকল মৃত্যু সমান নয়। কবির ভাষায়-

‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’ ।

বঙ্গবন্ধু প্রকৃতই একজন জনদরদী, পরোপকারী, সত্যবাদী, বন্ধুবৎসল, অকুতোভয় বীর বাঙালি ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও তিনি সেই বৈশিষ্ঠ্য বজায় রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ক্ষয় নাই, তিনি অমর, অক্ষয়। বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধুর নাম ততদিন থাকবে। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর নশ^র দেহ হত্যা করেছে, তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে পারে নি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অদুর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ উন্নত বিশে^র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে ইনশাল্লাহ।
জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের বৈশিষ্ঠ্য যে একছিলো তা জীবনের এই প্রথম ও শেষ ঘঠনা থেকে প্রমাণিত যা বিশে^র ইতিহাসে বিরল।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD