মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন

প্রিয় ঋতু -খাইরুন নাহার চৌধুরী

প্রিয় ঋতু -খাইরুন নাহার চৌধুরী

বর্ষা আমার প্রিয় ঋতু, তাই বলে কি শরৎ প্রিয় না? শরতও ভীষণ প্রিয় । শরতের শুভ্রতা মনকে পবিত্র করে দেয়। ঝকঝকে নীল আকাশে থোকা থোকা সাদা মেঘ, শিউলি তলায় ঝরা শেফালীর মিষ্টি সুবাস,কামিনীর পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরের টুপটাপ শব্দেরা শরতের ভোরবেলাকে ভীষণ রকম স্নিগ্ধ করে তুলে । আমাদের বাড়ির সামনের মাঠটাতে কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটলে শিশিরে ভিজ একেবারে চুপচুপে হয়ে যেতাম । সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি প্রায় সময় আমাদের নীল রংয়ের লোহার ফটকটা আস্তে করে খুলে ,বাড়ির সামনের মাঠটাতে কিছুক্ষণ একাই হাঁটতাম । সবুজ ঘাসের গালিচার উপর শিশির বিন্দুগুলো ঠিক হীরের মতো ঝলমল করতো । স্যান্ডেলটা একপাশে খুলে রেখে, খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে উপভোগ করতাম শরতের সকালের স্নিগ্ধতা ।
সেই সময় আমাদের বাসায় আমার বয়সি একজন কাজের সহযোগী ছিল, নাম হনুফা। হনুফা ময়মনসিংহের মেয়ে । একদিন খুব ভোরে আমি মাঠে একা খালি পায়ে হাটছিলাম । হনুফা চুপিচুপি আমার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল হয়তো,খেয়াল করিনি ।
হঠাৎ রিনরিনে গলায় অবাক হয়ে বললো, “আফা আফনে এত্তো সকাল সকাল এইখানে কি করতেছেন!? আমি চমকে পিছন ফিরে তাকাতেই সে চিৎকার দিয়ে বললো, আল্লাহ্গো ! ফাও দেহি স্যান্ডেলো নাই ! সালোয়ার তো খোয়ায় (শিশিরে) এক্কেরে ভিজ্জা গেছে ! আম্মায় দেখলে কইলাম আফনের আইজ খবর আছে ! জলদি বাসার ভিত্রে যান । আমি কল কলতলায় পানি ধরে রাখছি ,পা ধুয়ে নিবেন ।আম্মায় জিজ্ঞেস করলে কইবেন ,স্যান্ডেলে ধুলা লাগছিল তাই কলপাড়ে এসেছি । আমি হনুফাকে দিলাম এক ধমক । বললাম ,কিসের খবর আছে ? যা ভাগ এখান থেকে । আমি কি করবো আর কি বলবো , তোকে বলতে হবে না । আব্বা বলেছেন মাঝে মাঝে খালি পায়ে শিশিরে হাঁটতে, আমি আব্বার সাথে কয়েকদিন এসেছিলাম, আমার ভাল লেগেছিল । হনুফা তখন চোখ বড় বড় করে বললো” আব্বায় কইসে খালি ফাওয়ে আটতে !?” আব্বায় দেহি নাক ডাইক্কা ঘুমাইতাছে !” বললাম, রোজ তো আর হাঁটি না । হঠাৎ ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে এখানে আসি । হনুফা আমাকে আর ঘাটালো না, তার কাজে ফিরে গেলো ।
আমি তখন টুকটাক কবিতা লিখি । আব্বা প্রতিবছর কয়েকটি ব্যাংক থেকে ডাইরি আর ক্যালেন্ডার পেতেন । সেই ডাইরিগুলো থেকে দু-একটা আমার ভাগে থাকতো । আমি ডায়েরিতে রোজ কিছু না কিছু লিখতাম । সেই ডাইরিটা লুকিয়ে রাখতাম আলমিরার কাপড়ের ভাঁজে,যাতে কারো চোখে না পড়ে । কবিতা লিখতাম, রোজনামচা লিখতাম, মন খারাপ হলে সেগুলো লিখে রাখতাম ,আনন্দের কিছু ঘটলে সেটাও লিখতাম । একবার ইচ্ছে হয়েছিল এগুলো কাউকে দেখাই । কিন্তু সেই ইচ্ছা কর্পূরের মত উড়ে গিয়েছিল সেদিন ,যেদিন স্কুলের বাংলা ক্লাসে “বড় হয়ে কি হতে চাও” লিখতে গিয়ে লিখেছিলাম , আমি বড় হয়ে কবিতা লিখতে চাই ,গল্প লিখতে চাই । আমাদের বাংলা টিচার সেদিন বলেছিলেন ,কবি হবে !? কবিতা লিখতে কত জানতে হয়,কতো পড়তে হয়, কবিতার নিয়ম কানুন শিখতে হয়, জানো এসব?
মাথা থেকে কবিতার চিন্তা ঝেড়ে ফেলে এখন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো । ক্লাসের সবাই সেদিন হাসাহাসি করেছিল । ফুলকপি বাঁধাকপি বলে ঠাট্টা করছিল ,লজ্জায় আমার চোখে পানি চলে এসেছিল । আজ এই বয়সে এসে টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো মনের জানালায় মাঝে মাঝেই উঁকি দেয় । সেদিন আমি ভালোবাসা ,আবেগ আর শব্দ দিয়ে কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম ,সবাই থামিয়ে দিল । এখন আবার টুকটাক লেখার চেষ্টা করছি । সারাদিন সংসারের কাজ, ব্যবসার কাজ, নানান রকম দায়িত্ব পালন শেষে রাতে বসি খাতা-কলম নিয়ে , কখনও লেখি কখনো পড়ি । কোন কোনো লেখা সাহস করে পোস্টও করি । এখন কেউ বলে না ,আপনার লেখাতে ব্যাকরণের ভুল আছে, শব্দের গাঁথুনি নেই , কবিতাগুলো আসলে কবিতা হয়নি ! আর বললেও আমার মন খারাপ হয় না । আমি আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে লিখি ,অতশত নিয়ম কানুন মেনে লিখিনা । আহা! শরত নিয়ে লিখতে গিয়ে কবিতায় চলে আসলাম ! আমি যে শরৎকালের কথা বলছি সেটা আমাদের ছেলেবেলার শরৎকাল ।আমাদের শহরে তখনও অট্টালিকার জঙ্গল হয়নি, কালো ধোঁয়া আর গাড়ির শব্দে প্রকৃতি তখনও তটস্থ হয়নি । স্নিগ্ধ এক শহরের শরতের কথা বলছিলাম । এখন আমার সেই ছোটবেলার শহর আর আগের মত নেই । ইট-পাথরের নগরে আমাদের আবেগগুলো, শিশিরের ফোটা গুলো ,কাশের বনগুলো সব ঢাকা পড়ে গেছে ।

আজ ০৯ আশ্বিন,
১৪২৮ বঙ্গাব্দ
শরৎকাল।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD