সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১৭ অপরাহ্ন

নড়াইল পৌর কবরস্থানে গুড়িয়ে দেয়া কবরগুলো পুনঃস্থাপনের দাবি –আফরোজা পারভীন

নড়াইল পৌর কবরস্থানে গুড়িয়ে দেয়া কবরগুলো পুনঃস্থাপনের দাবি –আফরোজা পারভীন

নড়াইল পৌর কবরস্থানে গুঁড়িয়ে দেয়া কবরগুলি পুনঃনির্মাণ দাবি ও কিছু অভিজ্ঞতা :
নড়াইল পৌর কবরস্থানে রাতের আঁধারে বুলডোজার চালিয়ে কবর ধ্বংস করার খবর পাবার পর স্তব্ধ হয়ে যাই! কাঁদতেও ভুলে যাই কিছু সময়ের জন্য। সবচেয়ে বেশি ভয় হতে থাকে আমার সদ্য হাসপাতাল থেকে ফেরা মেজভাই-এর জন্য। আব্বা মা পিতামহ ছাড়াও যার ২২ বছরের অকালপ্রয়াত কন্যা ওখানে ঘুমিয়ে আছে। খবর পাই দাদা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে, চলৎশক্তিরহিত। কান্নায় ভেঙে পড়েছে আমার নড়াইলবাসী আপজনেরা । শহর জুড়ে শ্মশানের নিস্তব্ধতা আর গোপন কান্না! কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না তারা। তারপর আস্তে আস্তে ফুঁসে ওঠে। আর সর্বশেষ পরিস্থিতি আপনারা আমার গতকালের স্ট্যাটাসে জেনেছেন। এখন একটাই দাবি কবর পুনঃনির্মাণ, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া।
আমি একজন ক্ষমতাহীন মানুষ, বড় কারো সাথে যোগাযোগ নেই। ভয়ানক রকম অসুস্থও । চাকরি আর লেখালিখি করে জীবনপাত করেছি। সাধ্য নেই তেমন কিছু করার । তবুও সাধ্যমতো ঝাঁপিয়ে পড়ি। দিনের পর দিন লিখতে থাকি। নড়াইলের তরুণ সমাজের সাথে যোগাযোগ রাখি। তারা প্রতিটি খবরাখবর আমাকে জানায়। আমি সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে মাননীয প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য প্রার্থনা করি। দেশের কবি সাহিত্যিক শিল্পী সাংবাদিকসহ সচেতন সমাজকে এই দাবির পক্ষে একাত্মতা ঘোষণার আহবান জানাই। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয়, অল্পসংখ্যক কবি সাহিত্যিক শিল্পীকে পাশে পাই। যারা সমবেদনা আর এ নৃশংসতম কাজের প্রতি নিন্দা জানিয়েছেন তাদের অন্তর্ময় ধন্যবাদ! কয়েকজন লেখককে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে লিখতে অনুরোধ করি। তারা প্রায়শই বিভিন্ন বিষয়ে লিথে থাকেন। বিশেষ করে আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইবোনদের ব্যাপারে কোন ঘটনা ঘটলেই তারা কলম ধরেন। কিন্তু এতবড় একটি মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে লেখার অনুরোধ করার পরও তারা দু’কলম লেখেননি। তারা কী মনে করেছেন কবরস্থান ‍গুড়িয়ে দেয়া নিয়ে লিখলে তাদের সাম্প্রদায়িক বলবে? জানি না। তারা কিন্তু মুসলিম । দুজন নারী নেত্রীকে এ ব্যপারে সাহায্য করার অনুরোধ জানাই। একজন সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং আমাকে কিছু পরামর্শও দেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা সেটা প্রমাণ করেন। অপরজন আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চেয়েছি বলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। বলেন, আমি নাকি তোষামুদি করছি। আমি রাজনীতিবিদ নই, নারী নেত্রী নই, একজন সাধারণ মানুষ। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য তো চাইবোই। আমার বাবা মা আপনজনের কবর গুড়িয়ে দিয়েছে , কবর গুড়িয়ে দিয়েছে আমার নড়াইলবাসী অসংখ্য চেনা জানা আপন মানুষের। আমি চেষ্টা কবর না! হাত গুটিয়ে বসে থাকব! অদ্ভুত! দেখলাম, ভিন্নমতের হলেই কেউ পাশে দাঁড়াতে চায় না। সাহায্যের হাত বাড়ায় না। ইস্যুু সেখানে বড় না, ঘটনার গুরুত্ব নেই। আগেও দেখেছি আমাদের নেতা- নেত্রীদের সিংহভাগ আপন প্রয়োজনেই জাগেন, ঘুমান । অধিকাংশই বর্ণচোরা। এবারও তাই দেখলাম।
ঢাকাস্থ নড়াইল জেলা সমিতি আছে, নড়াইল উন্নয়ন আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত নড়াইলের ছাত্রদের সংগঠন আছে। কেউ একটা মানববন্ধন করলো না, নিন্দা প্রস্তাব পর্যন্ত আনলো না। তাহলে তাদের কাজ কী শুধু অভিষেক, বনভোজন আর খাওয়া দাওয়া! আর নমিনেশান বাগানোর চেষ্টা? এসব লোক দিয়ে নড়াইলের মানুষের কোন উপকার হবে না আমি নিশ্চিত। ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেও দেখেছি। ফল হয়নি। এরাই কেউ কেউ কিন্তু দশ বছর পর সগর্ব বলবে , কবরস্থান পুনঃনির্মাণ আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলাম। যেমন বলে থাকে, এরাই নাকি নড়াইল জেলা বানিয়েছিল। এদের কেউ কেউ প্রয়োজন মতো সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বলে নড়াইল কবরস্থানে ওমুক বিশিষ্ট ব্যক্তি শুয়ে আছেন যিনি আমার আত্মীয়।
এরা ছাড়াও ঢাকায় নড়াইলের মানুষ আছে। যারা প্রাণের টানে নড়াইলে চলে গেছে, আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, বক্তব্য দিয়েছে। তাদের কেউ ডাকেনি। পূর্ব পুরুষের কবররক্ষায় সর্বস্ব বাজি রেখে তারা গেছে। তাদের সাধুবাদ জানাই!
এ আন্দোলন কারো একার নয়। সমস্ত নড়াইলবাসীর। এখানে কে সংসদ সদস্য, কে রাজনীতিবিদ, কে মুক্তিযোদ্ধা, কে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত এসব বিবেচনায় ছিল না। বিবেচনা পূর্বপুরুষের কবররক্ষা। যেন আমরা পরের প্রজন্মকে বলতে পারি, এটা আমার বাবার কবর, তোমার নানার কবর। এখানে প্রতিটি মানুষের আবেগ জড়িত । তাদের ভালবাসার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা রাখেনি বর্তমান মেয়র। তার কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নেই আমরা জানি। কিন্তু বিবেকবোধও নেই দেখলাম। তার গুণপনা জাহির করার জন্য কিছু লোককে দেশে -বিদেশে তৈরি রেখেছে। তারা সমানে ফতোয়া দিয়ে যাচ্ছে আর তার গুণ গাইছে!
স্থানীয় সংসদ সদস্য গতকালের সভার উপস্থিত থেকে বলেছেন, ঘটনা ঘটার আগে তিনি জানতেন না! তবে তিনি জানতেন না বললেও এ দায় দায়িত্ব তিনি এড়াতে পারেন না বলেছেন। আসলেই তিনি তা পারেন না। সেটা জনসমক্ষে বলেছেন বলে ধন্যবাদ। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মহোদয় অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের মর্যাদা পুরোমাত্রায় রক্ষা করেছেন। তিনি জেলা পরিষদের জমি কবরের জায়গা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ দেবার ঘোষণা দিয়েছেন। তাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
লেখক জীবনের শুরু থেকেই দল মত ধর্ম বর্ন নির্বশেষে যেখানে অন্যায় দেখেছি প্রতিবাদ করে লিখেছি। কিন্তু নড়াইলের এতবড় ঘটনায় দেখলাম মানুষ মূলত একা, কেউ কারো নয়। সবাই ভাবে, ওর হয়েছে আমার তো হয়নি। হবে না। কিন্তু হবে এটা নিশ্চিত।
এভাবেই বুঝি মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এ ঘটনায় সে প্রক্রিয়া আমার মধ্যেও শুরু হয়ে গেছে!
শুনছি সভায় সিদ্ধান্ত হলেও নড়াইল কবরস্থান পুনঃনির্মাণ নিয়ে এখনও গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।
নড়াইলবাসী প্রিয় ভাই-বোনেরা, সজাগ থাকুন, রুখে দাঁড়ান। যে কোন মূল্যে কবরগুলি পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD