সোমবার, ১৫ Jul ২০২৪, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

নিয়তি : নূরুন্নাহার বেগম

নিয়তি : নূরুন্নাহার বেগম


কষ্টের নীল নদের মোহনায় হাবুডুবু খেতে খেতে বড্ড ক্লান্ত প্রিয়তা।  মাঝে মধ্যে  দু’চোখ অশ্রুসিক্ত, মনটা অশান্ত হয়ে উঠে কেবলই।  কী করবে সে!  শারীরিক অসুস্থতা মেনে নিয়েই কষ্টের সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে তাকে।
দীর্ঘ পাঁচ বছরের সংসার জীবনে এমনটি ঘটেনি। এক বছরের সন্তান কোলে।  জাভেদ অফিসে।  বাচ্চাকে সামলানো, সংসারের নানা কাজের ব্যস্ততায় দিন কাটে প্রিয়তার।  ছুটির দিনগুলোয় সন্তানকে নিয়ে ওরা দুজনাই হারিয়ে যেত সাদা কাশবনের নিরালায়, কখনো রিমঝিম দুপুরে ঘুরে ফিরে নিঝুম সন্ধ্যায় গৃহবন্দী হয় নিত্যদিনের মত।  একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে এঘর ওঘর করতেই কখন যে পায়ের নীচে সন্তানের ফেলে রাখা খেলনা পড়ে এত বড় বিপদ ডেকে আনলো।  মুহূর্তেই যেন সব ওলোট পালোট হয়ে গেল ওর।  শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে  সন্তান সহ হুমড়ি খেয়ে সম্মুখে পড়ে গেল প্রিয়তা।  সন্তানকে রক্ষা করতেই নিজের হাঁটুতে শরীরের সমস্ত ভর সঁপে দিয়ে রক্ষা হলো না হাঁটু ভাঙ্গার যাতনা।  একাকী বাসায়।  বর অফিসে।  ফোন করবে, নাকি কেঁদে হালকা হবে,  সন্তান সামলাবে সেকি বেহুশ অবস্থা।  প্রথম প্রথম শুনে জাভেদ বুঝতে পারেনি এতটা সিরিয়াস সে !  প্যারাসিটামল খেতে বলে অফিস থেকে ফেরার চেষ্টা করেছে জাভেদ ।  জ্যাম থাকলে তিন ঘন্টার কমে আসা সম্ভব নয় ।  প্রিয়তার রাতজাগা আঁখি প্রতীক্ষায় থাকে।  বাইরে বর্ষার অঝোর ধারা।  জাভেদ আসতে আসতেই কোন হাসপাতালে নেওয়া যায় ঠিক করে সিরিয়াল দিয়ে রেখেছে।
হাসপাতালের অর্থোপেডিক ডা. পায়ের এক্সরে, প্লাসটার করে দিয়ে দশদিন পর আবারো দেখাতে বললেন।  মনে মেঘের আঁধার নামে প্রিয়তার। চঞ্চলতা থেমে যায় তার।  হৃদয়ের শাখাপ্রশাখা দোলে।  মাসাধিককাল ক্রাচে ভর করে চলতে চলতে হৃদ সাগরে ঢেউ উঠে।  কতকাল কত জায়গায় বেড়ানো হয়নি।  ইচ্ছেঘুড়ি ওড়াতে মন ছুটে যেতে চায় দূর পানে,  স্বপ্নের ডানায় ভর করে মন, ঘুমালেও ঘোরে স্বপ্নের রাজ্যে।
চোখ খুলতে পারছে না প্রিয়তা।  কোথায় আছে সে তাও জানে না। হঠাৎ পায়ে ব্যথা অনুভব করলো। মনে হলো কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে পায়ে সাই করে টান দিলো। চোখ খুলতেই দেখে আশেপাশে অনেক লাশ। ভয়ে গা শিউরে উঠলো ওর। বুঝতে কিছু বাকি রইলো না আর যে,  সে মর্গে আছে।  হঠাৎ  চিৎকার দিয়ে বলতে শুরু করলো ‘আমি মরে যাইনি, বেঁচে আছি, আমি বেঁচে আছি।’ কেউ শুনছে না তার কথা। উপস্থিত সবাই দৌড়ে পালাতে লাগলো। ও উঠে দৌড়াতে শুরু করলো । একজন নার্সের দেখা পেল সে । তাকে অনেক অনুরোধ করার পর তার ফোনটা  নিয়ে বরকে অনেকবার কল দিয়ে  সাড়া পেলো না। বড় ভাইয়ের ফোন নম্বরটাও মনে করতে পারছে  না সে।  ওর আম্মুকে ফোন করে সব বললো প্রিয়তা । বর এলে তাকে সব বলছে, ‘ আমি এখানে কেন। আমার মেয়ে কোথায়। আমি তো কাল রাতে বিরিয়ানি রান্না করে খেয়ে ঘুমালাম।’  সবাই তখন প্রিয়তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সবাই এটাই জানে প্রিয়তা নেই।  সে  নাকি  কয়েক দিন  থেকেই মর্গে পড়ে আছে।
শারীরিক অসুস্থতা মানুষের মনকেও অসুস্থ করে দেয়। প্রিয়তা ভাবে দুনিয়াটা এত বৈচিত্র্যময় কেন!   মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। ক্ষণিকে মনে প্রেমের হাতছানি। জাভেদ ডাকছে প্রিয়তাকে, ‘কী সব বলেই যাচ্ছ প্রিয়তা, ওঠার চেষ্টা করো,  আমি অফিসে যাচ্ছি তো।’
ঘুমের ঘোরে বলেই যাচ্ছে প্রিয়তা ‘নীল চাদরে বৃষ্টির ছোঁয়া, বুকে কষ্টের স্বাদ; বৃষ্টির ফোঁটা উঠুক নেচে, কাটবে বিরহী ফাঁদ।’
পূর্বাপর/০৯/০৭/২০২৪/আকাশ

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD