সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০৬ অপরাহ্ন

নারী পাচার – তসলিমা নাসরিন

নারী পাচার – তসলিমা নাসরিন

নারী পাচার

নারী পাচার
তসলিমা নাসরিন

বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রতি বছর কুড়ি হাজার নারী পাচার করা হয়। বর্ডারের গার্ডদের মাথাপিছু ৩০০/৪০০ টাকা দিলেই তারা বর্ডার পার করে দেয়। মেয়েদের সঙ্গে প্রতারণা করা সহজ, মেয়েদের ভয় দেখানো সহজ, মেয়েদের ওপর গায়ের জোর খাটানও সহজ, বর্ডার পার করা সহজ, মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়াও সহজ। এই সহজ কাজটি এখন অনেকেরই উপার্জনের উৎস।

একবার দুর্বার সংগঠনের তত্ত্বাবধানে কলকাতার সোনাগাছি পতিতালয় দেখতে গিয়েছিলাম আমি। দুর্বারের কাজ সোনাগাছির মেয়েদের অসুখ-বিসুখ সারানো, বাচ্চাদের ইস্কুলে দেওয়া, যৌনকর্ম যেন শ্রম হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পায় সেই চেষ্টা করা। সেদিন সোনাগাছির মেয়েদের এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছিল। তাদের উদ্দেশে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। সবাই যা শুনতে আশা করেছিল, তা আমি বলিনি, কারণ আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি বলিনি যে আপনাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে, আমি বলিনি যে আপনারা যে কাজটি করছেন, তা ভালো কাজ। আমি বলেছি, ‘আপনারা এখানে বাধ্য হয়ে এসেছেন, কেউ আপনাদের বিক্রি করে দিয়েছে, অথবা অভাবের তাড়নায় আর কোনও পথ খোলা নেই বলে এই পথে এসেছেন, পছন্দ করে এই পথে আসেননি, শ্রমিকের পরিচয় পাওয়ার চেয়ে পুনর্বাসন পাওয়াটা জরুরি, পতিতা প্রথাটির অবলুপ্তি হওয়া ভীষণই জরুরি।

’ পুলিশ এবং দালালের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য শ্রমিকের স্বীকৃতি চাই, এই যুক্তি খুব হাস্যকর। যেন শ্রমিকেরা কারো অত্যাচারের শিকার হয় না! আসলে শ্রমিকের স্বীকৃতি পেলে যৌনদাসীদের যন্ত্রণার অবসান হবে, এ মিথ্যে কথা। লাভ তাদের, যারা মেয়েদের যৌনদাসী বানায়, হাটবাজারে মেয়েদের কেনাবেচা করে।


সোনাগাছির মেয়েদের ভিড়ে বাংলাদেশের ভাষায় কথা বলতে থাকা কিছু মেয়েকে দেখে প্রশ্ন করেছিলাম, বাড়ি কোথায়? কেউ বললো যশোর, কেউ বললো খুলনা, কেউ বললো রংপুর বা চট্টগ্রাম। ওদের চোখে আকুতি কাঁপছিল, যেন আমি ওদের বাঁচাতে এসেছি। ওদেরও বিচিত্র ইতিহাস। চাকরি দেবে বলে কেউ নিয়ে এসেছিল, তারপর বিক্রি করে দিয়ে গেছে। স্বেচ্ছায় একজনও এই নরকপুরীতে আসেনি।

নারীকে যৌনদাসী ভাবা হয় বলেই নারীর জন্য পতিতালয় খোলা হয়। নারীকে যৌনবস্তু ভাবা হয় বলেই নারীর ওপর যৌন নির্যাতন চলে।

নারীকে যৌনপণ্য ভাবা হয় বলেই নারীকে এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাচার করা হয়।
যৌনদাসী প্রথা অনেকটা এককালের ক্রীতদাস প্রথার মতো। আঠারো/উনিশ শতকে যে প্রথাটিকে বলা হতো ক্রীতদাস প্রথা, বিংশ/একবিংশ শতকে সেই প্রথাকেই বলা হচ্ছে যৌনদাসী প্রথা বা পতিতা প্রথা। ইংরেজিতে বলে ‘মডার্ন ডে সেøভারি’। এই পৃথিবীতে মেয়েদের বিরুদ্ধে নিশ্চিতই একটা যৌনযুদ্ধ চলছে। দীর্ঘ দীর্ঘকাল এই যুদ্ধটা চলছে। এটাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা বলে লোককে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা হয় বটে, আসলে এটা কিন্তু মেয়েদের বিরুদ্ধে ‘পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্যাতন’। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিরুদ্ধে বলাটা ঠিক নয়, মেয়ে-শিশুদের বিরুদ্ধেও বটে। আজ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র শিশুদের জোরজবরদস্তি করে, ভয় দেখিয়ে, ধর্ষণ করে, মেরে আধমরা করে যৌনক্রীতদাসী বানানো হচ্ছে। পুরুষের যৌনক্ষুধা মেটাতে, পুরুষের শরীরকে কিছুক্ষণের জন্য পুলক দিতে লক্ষ কোটি অসহায় মেয়ে ও শিশুকে বেঁচে থাকার সর্বসুখ বিসর্জন দিতে হচ্ছে, মানুষ হয়েও মানুষের ন্যূনতম অধিকার থেকে তারা নিজেদের বঞ্চিত করতে বাধ্য হচ্ছে।

পতিতা প্রথার সহজ সংজ্ঞা হলো, ‘মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন নির্যাতন’। আরও একটু খুলে বললে পতিতা প্রথার মানে ‘মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন হেনস্তা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, মেয়েদের ওপর পুরুষের অবাধ আধিপত্য, মেয়েদের মানবাধিকার লঙ্ঘন। ’ এসব যদিও যে কোনও গণতন্ত্রে আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতিতালয়ের ভেতরে বহাল তবিয়তে চলছে। পুরুষের পক্ষে যতটা ঘৃণ্যতম, কুৎসিততম, জঘন্যতম, উৎকটতম, কদর্যতম, নিকৃষ্টতম ব্যবহার কোনও মেয়ের সঙ্গে করা সম্ভব, তা নির্দ্বিধায় তারা করে পতিতাদের সঙ্গে।

যদিও এই ব্যবহার করলে আইনের চোখে তারা অপরাধী, কিন্তু পতিতাবৃত্তিকে বৈধ করলে এসব অপরাধ আপনাতেই বৈধ বলে মেনে নেওয়া হয়।
ভারতে মোট দেড় কোটি পতিতা, পৃথিবীর অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। অভাবের তাড়নায় বাবারা বিক্রি করে দিয়েছে মেয়েকে। প্রতারক প্রেমিকেরা বিক্রি করেছে, স্বামীরা জোর করে পতিতালয়ে পাঠিয়েছে যেন শরীর বেচে টাকা রোজগার করে স্বামীর মদের আর সংসারের খরচ চালায়। পতিতাবৃত্তির সঙ্গে নারীপাচার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ দুটো একে অপরের পরিপূরক। যারা দাবি করে পতিতালয়ের সব মেয়েই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, স্বেচ্ছায় এই পেশায় নাম লিখিয়েছে, তারা মিথ্যে বলে। পতিতালয়ের মেয়েদের বেশির ভাগই শিশু, বেশির ভাগকেই জোর করে বা ভুলিয়ে ভালিয়ে বা অপহরণ করে এনে বিক্রি করা হয়েছে। পতিতার জীবন সাধারণত মেয়েরা বারো-তেরো বছর বয়সে শুরু করে।

ওই বয়সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার কোনও স্বাধীনতা থাকে না, নানারকম বয়স্ক পুরুষের ধর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচানোর কায়দাও জানা থাকে না। পতিতাবৃত্তিতে মেয়েদের দারিদ্র্য ঘোচে না। লক্ষ কোটি টাকা যা আয় হচ্ছে যৌন-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে, সেসব টাকা পতিতাদের বা নির্যাতিত মেয়েদের হাতে পৌঁছয় না। মেয়েরা প্রতিদিন নারী-পাচারকারী, আর দালালের ভয়াবহ সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। মেয়েরা এই যৌন নির্যাতন থেকে বেরোতে চায়, কিন্তু তাদের বেরোতে দেওয়া হয় না। পছন্দমতো কোনও পেশা বেছে নেওয়ার কোনও অধিকার তাদের নেই।

নারী নির্যাতনকে কোনও না কোনও যুক্তিতে যারা মেনে নেয়, তারা দিব্যি দাবি করে মেয়েরা স্বেচ্ছায় পতিতা হয়। কিন্তু সত্যি হলো কোনও মেয়েই শখ করে, পছন্দ করে, সংগ্রাম করে পতিতা হয় না। অন্য কোনও বৃত্তিতে যাওয়ার জন্য যত সংগ্রাম আছে, সেই সবকটি সংগ্রামে ব্যর্থ হয়েই পতিতা হয়। মেয়েরা স্বেচ্ছায় অসম্মানিত, অপমানিত আর অত্যাচারিত হতে চায় না। মেয়েরা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে না যৌন নির্যাতন।

পতিতা বানাতে মেয়েদের বাধ্য করে পুরুষেরা। যদি মেয়েরা চায় পতিতা হতে, নিশ্চয়ই কোনও না কোনও কারণে বাধ্য হয়ে চায়। বাধ্য হয়ে চাওয়া আর স্বেচ্ছায় চাওয়ার মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান। কোনও মেয়ে শখ করে আগুনে ঝাঁপ দেয় না। সতীদাহের আগুনে মেয়েদের ছুড়ে দিয়ে বলা হতো মেয়েরা স্বেচ্ছায় ওই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছে। যে বউরা স্বামীর মার খায়, সেই বউদেরও বলা হয় স্বামীর মার খেতে তাদের ভালো লাগে। যারা চায় বউরা স্বামীর মার খাক, তারাই এই রটনা রটায়। ক্রীতদাসরা যেমন চাইতো ক্রীতদাস প্রথার বিলুপ্তি, পতিতারাও পতিতা প্রথার বিলুপ্তি চায়। যে ব্যবসায়ীরা মেয়েদের যৌনবস্তু বানিয়ে ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছে, তারা মেয়েদের মুখ দিয়ে বলাতে চায় যে মেয়েরা পতিতা প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী। মেয়েদের মানবাধিকারের ব্যাপারটি যেন গণনার মধ্যে আনা না হয়, তাই এই আয়োজন। আর তা ছাড়া, ক্রীতদাস হতে চাই বলে কেউ যদি চিৎকার করে, তাকে কি ক্রীতদাস হওয়ার সুযোগ করে দেবো! কেউ যদি বলে শেকলে বেঁধে তাকে প্রকাশ্যে পেটানো হোক। পেটাবো? নিশ্চয়ই তাকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলার ব্যবস্থা করবো, আর যেসব কারণে অন্যায় আবদার সে করছে বা করতে বাধ্য হচ্ছে, সেই কারণগুলো দূর করবো।

মানুষের ওপর ঘৃণ্য আর অমানবিক নির্যাতনের কারণে ক্রীতদাস প্রথা আজ বিশ্বে নিষিদ্ধ। কিন্তু কী কারণে পতিতা প্রথাকে আজও পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না! গর্দভরা গালভরে উচ্চারণ করছে যে যুক্তিহীন কারণগুলো, সেগুলো কিন্তু সত্যিকার কারণ নয় যে ‘এই প্রথাটি টিকে ছিল, সুতরাং টিকে থাকবেই’ অথবা ‘বাজে চরিত্রের মেয়েরা এই পেশা চালিয়ে যাবেই’। এই প্রথাটি মেয়েদের মন্দ চরিত্রের জন্য নয়, ক্ষমতাবান এবং বদ পুরুষেরা এই প্রথাকে ছলে বলে কৌশলে টিকিয়ে রাখছে বলে টিকে আছে। আরও একটি ভুল সংশোধনের প্রয়োজন। শরীর বিক্রি করা কিন্তু পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা নয়। কৃষিকাজ ছিল মানুষের প্রাচীনতম পেশা।

আজ পতিতা প্রথা বা যৌন নির্যাতন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তো বটেই, সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়ে ওঠা সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই কারখানার কাঁচামাল দুর্ভাগা, অনাথ, শিশুদের আর দরিদ্র, প্রতারিত মেয়েদের শরীর।

সভ্য দেশগুলো এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে সুইডেনই প্রথম নারী নির্যাতন ব্যবসাটিকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। পতিতা প্রথাকে সরকারিভাবে ‘নারীর ওপর পুরুষের জঘন্য যৌন নির্যাতন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সুইডেন। পতিতা ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে শরীর কেনা নিষিদ্ধ। যে পুরুষই শরীর কিনতে চায়, সে-ই অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। শরীর কেনার লোক না থাকলে, শরীরের বাজার-হাট আপনাতেই উঠে যায়। পুরুষের আনন্দ ফুর্তির জন্য পুরুষরাই টিকিয়ে রেখেছে এই যৌন নির্যাতনের ব্যবসা। সুইডেনে শরীর বিক্রি কিন্তু নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় বলে দুর্ভাগা দরিদ্র মেয়েরা যারা শরীর বিক্রি করার জন্য রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে বা এদিক ওদিক খদ্দের খুঁজে বেড়ায়, তারা পুলিশি হেনস্তার শিকার হয় না। অপদস্থ করা তো দূরের কথা, তাদের স্পর্শ করাও অপরাধ। কিন্তু যেই না কোনও পুরুষ কোনও মেয়েকে কিনতে নেবে, অমনি ক্রেতা পুরুষের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হবে। নিরানব্বই সালে এই আইনটি জারি করার পর সুইডেনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পতিতাবৃত্তি। এভাবেই রোধ করা যায় এই নারী নির্যাতন ব্যবসা। অনেকের প্রশ্ন, পতিতারা শরীর বিক্রি ছাড়া অন্য আর কোনও কাজ করতে পারবে কি না। প্রথমেই মনে রাখতে হবে পতিতাবৃত্তি কোনও পেশা নয়, পতিতাবৃত্তি নির্ভেজাল যৌন ক্রীতদাসিত্ব, যৌন নির্যাতন।

বেশির ভাগ দেশে পতিতালয়ের ভেতরে মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন চললে অসুবিধে নেই। পতিতালয়ের সীমানা ডিঙোলে ভদ্র পরিবেশকে কলুষিত করার দায়ে পতিতাদের লাঞ্ছিত করা হয়। যারা মূল অপরাধী, যারা নির্যাতনকারী, তাদের শাস্তি না দিয়ে মেয়েদের, নির্যাতিতদের দেওয়া হয় শাস্তি। পৃথিবীর সব দেশেই যদি আজ সুইডেনের আইনের মতো শরীর ক্রয় করা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে নারী নির্যাতনের ব্যবসা এত ফুলে ফেঁপে উঠবে না।

পতিতা প্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতা প্রথা বৈধ সেই রাষ্ট্র সত্যিকার কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। কোনও সভ্যতা বা গণতন্ত্র মানুষের ওপর নির্যাতনকে ছল ছুতোয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে না, করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। লেখক। : নির্বাসিত লেখিকা কৃতজ্ঞতা : Subrata Biswas

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD