রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:১০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ গবেষক এস এম শাহনূরের তিন দিনের ট্যুরিস্ট মেলায় টুরিস্ট পুলিশের সরব উপস্থিতি ভারতীয় পর্যটকদের বরণ করে নিল ট্যুরিস্ট পুলিশ আজ চাষারপুত খ্যাত কবি ও চলচ্চিত্রকার মাসুদ পথিকের জন্মদিন ট্যুরিস্ট সুবিধা বাড়াতে প্রশিক্ষণের উপর অতিরিক্ত আইজিপির গুরুত্ব আরোপ পর্যটন শিল্পের মহাপরিকল্পনা শীর্ষক সেমিনার পর্যটন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ৪০তম বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তারা আজ ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাহিত্যতত্ত্বে আমার অতৃপ্তি -হাসনাইন সাজ্জাদী বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন -হাসনাইন সাজ্জাদী ঢাকায় বসেও মন উড়ে গিয়েছিল ভার্জিনিয়ার ডিসি বইমেলায় -হাসনাইন সাজ্জাদী
নাজমা চৌধুরী স্মরণ।।নমিত হই শ্রদ্ধায় -সেলিম জাহান

নাজমা চৌধুরী স্মরণ।।নমিত হই শ্রদ্ধায় -সেলিম জাহান

নাজমা চৌধুরী স্মরণ।।নমিত হই শ্রদ্ধায় -সেলিম জাহান

নমিত হই শ্রদ্ধায়

তাঁর নাম প্রথম শুনি সম্ভবত: পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে। কিশোর বয়স তখন। সারাদিন রেডিও শুনি – নানান বেতার কেন্দ্রের। ঢাকা বেতারে শুনছি একদিন বিকেলে। অনুষ্ঠান ঘোষক ঘোষণা করছেন, ‘এখন গিটার বাজাবেন নাজমা জামান’। অপূর্ব বাজিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাদনের চেয়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম আর একটি কারনে। ঢাকা বেতারে তখন গিটার বাদনে নিরঙ্কুশ আধিপত্য পান্না আহমেদের এবং কিছুটা বোরহানউদ্দীন আহমেদের। এ দু’পুরুষের সাম্রাজ্যে একজন নারীও যে ক্ষমতাসীন, সেটা ভেবেই ভালো লাগছিলো।

তাঁর নাম আবারো কানে আসে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আমার মাতুল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তিনিই সপ্রশংস গল্প করেন তাঁদের তরুন প্রভাষক নাজমা চৌধুরী সম্পর্কে। তারপর দীর্ঘ বিরতি। ইতিমধ্যে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গিয়ে ১৯৭২ সালে যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি ১৯৭৫ সালে, বিদেশে যাই উচ্চশিক্ষার জন্যে দু’বছর পরে। ১৯৮৪ সালে যখন দেশে ফিরে আসি, তখন নাজমা চৌধুরী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। সেই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সভা-সমিতিতে দেখা হয়, তিনি সংবাদে আমার লেখা পড়েন, বেতার-টেলিভিশনে আমার অনুষ্ঠান দেখেন ও শোনেন। আমার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিতার পরিচয় পেয়ে একদিন অনুযোগ করেন, ‘কই, আপনি তো কখনো বলেন নি।’ আমি চুপ করে থাকি।

নব্বুইয়ের প্রথমদিকে আমি জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরে যোগদান করি। ১৯৯৫ সালে আমার নেতৃত্বে সে বছরের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বেরোয় নারী-পুরুষের সমতা বিষয়ে। বেইজিং সম্মেলনের ঠিক আগে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনটি ভীষনভাবে আদৃত হয়েছিল তার প্রাসঙ্গিকতা, বক্তব্যের বলিষ্ঠতা, সৃজনশীল সূচক উদ্ভাবন ও ব্যতিক্রমধর্মী নীতিমালা প্রস্তাবনার জন্যে।

সে প্রতিবেদনে দু’টো উপাত্ত ছিল – প্রথমত: বিশ্বঅর্থনীতিতে নারীদের ঘরোয়া গৃহকর্মের অমূল্যায়িত কাজের মূল্য হচ্ছে ২১ ট্রিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয়ত: বিশ্বের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ নারী। বলে নেয়া ভালো যে, দু’টো উপাত্ত খুব সরল কিছু অনুমানের ভিত্তিতে খামের পেছনে হিসেব কষে বের করা। এর মূল উদ্দেশ্য কিন্তু সঠিক সত্যিকার সংখ্যা বের করা নয়, বরং সার্বিক বিষয়টি সম্পর্কে একটি ব্যাপ্ত সচেতনতা সৃষ্টি করা। প্রথম সংখ্যাটির হিসেব করেছিলাম লন্ডনে বসে আমি আর London School of Economics & Political Science এর অধ্যাপক লর্ড মেঘনাদ দেশাই। দ্বিতীয়টি নিউইয়র্কে এক রাতে আমার দপ্তরে বসে কফি খেতে খেতে আমি আর আমার মিশরীয় সহকর্মী মোয়েজ দোরেদ। উপাত্ত দুটো এখন সার্বজনীনভাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদনটি নাজমা চৌধুরীর মনোযোগ কেড়েছিলো। বিভিন্ন জায়গায় ওটার প্রশংসা করতেন, প্রতিবেদনটি থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। একবার দেখা হলে পরে (তখন সম্ভবত: তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সংখ্যা গুলো পেলেন কোথায়’? হেসে বলেছিলাম ‘হৃদয় থেকে’। তাঁর গাম্ভীর্য্য ভেঙ্গে আমার পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলেছিলেন, ‘বাহ্! যোগ্য উত্তর’।

বহু বছর বাদে আবার দেখা ২০১৭ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা ঢাকায় নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ণ বিষয়ে আমার একটি একক লোকবক্তৃতার আয়োজজন করেছিলেন ৮ আগষ্ট। নাজমা চৌধুরী তখন স্বত:শ্চল বাহন ব্যবহার করেন। তিনি এসেছিলেন এবং সারাক্ষণ ছিলেন। প্রশংসা করেছিলেন বক্তব্যের এবং আলোচনা পর্বে প্রশ্নও রেখেছিলেন। তাঁর বলৎক্ষমতা যেহেতু সীমাবদ্ধ ছিল, তাই তাঁর স্নেহধন্যা অধ্যাপক আয়েশা বানু তাঁর বক্তব্য শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই আলোচনা সভায় নাজমা চৌধুরীর উপস্হিতি এবং আলোচনায় তাঁর অংশগ্রহন আমার জন্যে ছিল এক বিরাট প্রাপ্তি।

শেষ দেখা গতবছর। মার্চ নাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আমণ্ত্রিত হয়েছিলাম নাজমা চৌধুরী কর্তৃক ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Department of Women and Gender Studies আয়োজিত অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্হাপনের জন্যে। মজার এক শিরোনাম দিয়েছিলাম লেখাটির – ‘নারী মানে আনাড়ী নয়’। নিজের আবিষ্কৃত নয়, শামীমের এক লেখা থেকে নেয়া।

কন্যা বুশরাসহ সে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন নাজমা চৌধুরী। ভালো লেগেছিলো তাঁর পুরোনো আবেষ্টনী, বিভাগ, পুরেনো সহকর্মীদের মাঝে আসতে পেরে। তাঁর পাশে বসে প্রচুর গল্প করেছিলাম। ছবিও তুলেছিলাম এক সঙ্গে। সেদিন আমার একটি ভুল সংশোধন করেছিলেন তিনি। আমি জানতাম, তিনি বেহালা বাজাতেন। তিনি জানালেন, বেহালা নয়, তিনি গিটার বাজাতেন।

অধ্যাপক নাজমা চৌধুরী শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা বা নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক চর্চার একজন অন্যতম পথিকৃৎ।  ৮ আগষ্ট তাঁর প্রয়ানে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি অধ্যাপক নাজমা চৌধুরীকে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD