মঙ্গলবার, ২৩ Jul ২০২৪, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন

জবাবদিহিতায় ভালোবাসা ও ফিডব্যাক -পলক রহমান

জবাবদিহিতায় ভালোবাসা ও ফিডব্যাক -পলক রহমান

জবাবদিহিতায় ভালবাসা ও ফীডব্যাক
-পলক রহমান

জবাবদিহিতা হলো সুশাসনের মূল চাবিকাঠি। জবাবদিহিতা হচ্ছে সম্পাদিত কর্ম সম্পর্কে একজন ব্যক্তির ব্যাখ্যাদানের বাধ্যবাধকতা। এক্ষেত্রে সরকারকে যেমন জনগণের কাছে তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহি করতে হবে। জবাবদিহিতা না থাকলে সরকার স্বোচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে। সরকার স্বেচ্ছাচারী হলে সুশাসন থাকে না। জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা যদি দুর্বল হয় তবে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক- উভয় ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জনগনের জবাবদিহিতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। কারন সে একজন সম্মানিত ভোটার। তার ভোটটি যে যোগ্য প্রার্থীর ব্যালটে প্রবেশ করে সেদিকে তাকে সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু কি হয়? সাধারনতঃ দেখা যায় যে জনগন প্রায়ই অর্থের কাছে অথবা ভীতির কাছে মাথা নত করে তার মূল্যবান ভোটটি অযোগ্য প্রার্থীর প্রতীকে সীল মেরে আসে। সুতরাং পরবর্তীতে ভালোবাসা বা ভালো থাকা তো দুরের কথা ক্রমেই সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হতে হতে দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু জনগন তখন অযথাই কষ্ট পেয়ে নেতাদের গালিগালাজ করতে থাকে। ভুলেই যায় যে তার জবাবদিহিতার দুর্বলতার জন্যই এখন এই সমস্যা্র জন্য সমাজ দেশ তথা জাতি বিপর্যয়ের মুখে।
তবে সব চাইতে আগে যে বিষয়টা প্রয়োজন তা হল জবাবদিহিতার শিক্ষাটা জনগনকে দিতে হবে ছোটকাল থেকেই। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার পাশাপাশি পরিবারের কর্তাদের ভূমিকাকেও ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। আমরা ছোটকালে কি দেখেছি যে সন্ধ্যার পরে পড়তে বসিনি কেন বা বাড়িতে ফিরতে দেরী হল কেন এ নিয়ে বাবা মায়ের কাছে একটা জবাবদিহিতা ছিল। হয়ত এখনু আছে কোন কোন পরিবারে। আবার স্কুলের ক্ষেত্রে কেন লেট করে স্কুলে আসা হল, কেন দুদিন অনুপুস্থিত ছিলাম বা হোম ওয়ার্কটা করা হ্যনি কেন এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মহোদয়ের কাছে ছিল বিস্তর জবাবদিহিতা। কিন্তু উপেক্ষার বিষয় হল যে এই জবাবদিহিতাকে আমরা মানসিক প্যারা হিসেবে নিয়েছি বা বলতে পারি একটা উটকো ঝামেলা হিসেবে দেখেছি। এর মধ্যে যে সমিহ এবং ভালোবাসা দিয়ে পরবর্তীতে কোন ব্যত্যয় না হয় তার একটা কমিটমেন্ট আদায় করা যায় তা নিয়ে আমরা ভাবি না।
ইদানিং কর্পোরেট কালচারের জোয়ার চলছে। যদিও অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ সবের প্রতি এখনও একটু উদাসীন। তবুও বলব পরিস্থিতির উন্নতী হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। এটা একটা পজেটিভ দিক। কিন্তু কর্পোরেট কালচারের নিয়মনীতিতেও জবাবদিহিতার ব্যাপারে বেশ দায়সারা বলে মনে হয়। এর কারন হয়ত এমন যে যে চেয়ারে বসে কোন একজন এমপ্লোয়ী কাজ করছে সে জবাবদিহিতার বিষয়টা ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতার দিক থেকে মনযোগী হয়ে কখনই গড়ে উঠেনি। বরং সব সময় ভেবেছে কবে স্কুল কলেজের গোন্ডিটা পার হবে, কখন বাবামায়ের অনুশাসন থেকে বেরুতে পারবে। কখন একটা কোন রকমের চাকুরী জুটিয়ে এ সব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে ইত্যাদি।
সে কখনই ভাবেনি বা তাকে ভাবতে দেয়া হয়নি যে জবাবদিহিতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যা জীবনের কি ব্যক্তিগত, কি পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রিয় সব ক্ষেত্রেই পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে যে, যে মানুষটি নিজেকে জবাবদিহিতার মধ্যে রেখে দায়বদ্ধতায় তার কাজ সম্পাদন করে সে সব সময় ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠে সকলের কাছে। ফলে তার ব্যবসা হলে ব্যাবসায়, এমপ্লোয়ী হলে প্রতিষ্ঠানে, রাজনীতিবিদ হলে রাজনীতিতে সব খানে উন্নতী করার পাশাপাশি একজন উচ্চ পর্যায়ের কাংখিত মানুষ হিসেবে বিরাজ করছে। আমরা এ বিষয়টা নিয়ে আন্তরিকতা ও যত্নের সাথে সবসময় অনুসরণ করি না। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে চলে আসতে হলে প্রতিষ্ঠানের উপর দোষ চাপিয়ে দিই। কখনই ভাবি কেন আমাকে এ অবধি পাঁচ পাঁচটি অথবা চয় ছয়টি চাকুরী বদল করতে হোচ্ছে।
এখন জবাবদিহিতা নিয়ে খুব সাদামাটা করে যদি বলি তাহলে বলতে হয় “ফীড ব্যাক” বা তথ্য প্রবাহ যে কোন কর্মক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তথ্য প্রবাহ অর্থ এই নয় যে সংবাদটা এক সময় জানালেই হল। এই প্রবাহের সাথে জড়িয়ে আছে সঠিক সময়, উপযুক্ত বর্নণা, আসল তথ্য, তথ্যের ভেতর এবং বাহিরের তথ্য, বস্তু বা মানুষ, এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ (যদি থাকে) তার প্রবাহ। কিন্তু এমন দেখা যায় যে কোন একজন এমপ্লোয়ীকে একটা তথ্যের জন্য প্রেরন করা হল সে ভাবল অফিসের বাইরে আসতে পেরেছি একটু রিলাক্স করে দুটো আড্ডা দিয়ে তারপর না হয় তথ্যটা দেয়া যাবে। সে বুঝলই না যে তার ঊর্ধতন কর্তা ব্যক্তিটি ন্তাকে পাঠিয়েছে যথা সময়ে এত একটা “ফীডব্যাক” পাওয়ার জন্য। ফলে কাজের ক্ষতি হয়ে যায়। নেটওয়ার্কিং এ ছন্দপতন হয়। এমন কি অনেক বর ধরণের আর্থিক, সামাজিক বা ব্যাবসায়িক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। আর এ ক্ষত্রে যদি তার “ফীডব্যাক” তথ্যের বিলম্বের জন্য ওই সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তা ব্যক্তিটিকে নিজে থেকে পুনরায় ফোন করে খুঁজতে হয় তাহলে ভালোবাসা তো থাকবেই না বরং ভীষন রকমের দায়ীত্বহীনতার জন্য তার গুড বুক থেকে ঝরে পড়তে হয়। েবং আলটিমেটলী একসময় ছাটাই।
আজ এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গীক ভাবেই ছোট বেলায় বাবার মুখে শোনা একজন রাজা, উজির আর গোয়ালার গল্প মনে পড়ে গেল। এক গোয়ালা প্রতিদিন রাজার গোশালার গরু, দুধেল গাভীদের সারাদিন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, খাওয়ায়, দুধ দুয়ায়। সোজা কথা সারাদিনই তাকে হাড়খাটুনী খাটতে হয়। কিন্তু উজির মশায় রাজার দরবারে গিয়ে কিছুক্ষন বসে, কিছু কথাবার্তা বলে, মিষ্টি মোঠাই মন্ডা খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নিজ প্রাসাদে ফিরে যায়। রাজা মশায় মাস শেষে তাকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দেন। কখনও কখনও দরবারেই দামী দু’একটা মতির হারও ছুঁড়ে দেন। কিন্তু গোয়ালার কোন উন্নতী হয় না। স্বর্ণমূদ্রাও বাড়ে না যে তা নিয়ে একটু গয়াকাশি ভ্রমনে যাবে ভগবান দর্শনে। একদিন রাজার কাছে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে খুব কাচুমাচু করে কিছু একটা গিজ্ঞেস করবে বলে তার আদেশের প্রার্থনা করল। রাজা আশ্চর্য হলেও কৌতুহল বশতঃ তাকে অনুমুতি দেয়। গোয়ালা আমতা আমতা করে বলতে থ্যাকেঃ
– গোয়ালাঃ রাজা মশায় আমি তো সারাদিন গোশালায় গরু গাভীদের নিয়ে অনেক কষ্ট করি সারা দিন।
– রাজাঃ তো?
– গোয়ালাঃ উজির মশায় তো কিছুই করেন না। শুধু আপনার সাথে বসে কিছুক্ষনের জন্য আড্ডা দেয়, তারপর শাহী খাবার খেয়ে বিদায় নে।।
– রাজাঃ তো হয়েছে কি?
– গোয়ালাঃ না- মানে বলছিলাম কি রাজা মশায়, আমি এত কষ্ট করি দিন রাত আমাকে আপনি যতসামান্য স্বর্ণমূদ্রা দেন। কিন্তু…
– রাজাঃ কিন্তু কি বল, নির্ভয়ে বল।
– গোয়ালাঃ কিন্তু উজির মশায়কে আপনি প্রচুর স্বর্ণমূদ্রা দেন মাস শেষে।
– রাজাঃ তো হয়েছেটা কি?
– -গোয়ালাঃ এটা একটা অন্যায় হয়ে গেল না আমার বেতনের ব্যাপারে? বরং আমি দিন রাত খাটাখাটুনি করি। আমার বেতনটাই তো বেশী হওয়া দরকার বলে মনে করি।
– রাজাঃ (কোন রকম রাগান্বিত না হয়ে) তোমার কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগল যে তুমি সাহসের সাথে আমাকে একটা সুন্দর কথা বলেছ। ঠিক আছে তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি কেন এমনটা হয়। তুমি বলেছিলে এখান থেকে এক ক্রোশ দূরে পাল পাড়ায় এক কুমোরের একট গাই গরু বাচ্চা হয়েছে গত কাল।
– -গোয়ালাঃ জ্বী রাজা মশায়।
– রাজাঃ উজির সাহেব আপনি এখন যান। আমি ডাকলে পরে আসবেন। (উজির কুর্নিশ করে চলে যায়)। আচ্ছা বলত ওই বাছুরটার গায়ের রঙ কি?
– গোয়ালাঃ ঠিক মনে নাই হুজুর। ভুল বললে তো আবার গর্দান যাবে। বলতে পারছি না।
– রাজাঃ সমস্যা নেই। তুমি এক্ষুনি যাও। যেয়ে দেখে এসে আমাকে বল।

(গোয়ালা তড়িঘড়ি করে ছাতা মাথায় দিয়ে পালপাড়ার দিকে ছুটে যায়। যেয়ে দেখে বাছুরটির গায়ের রঙ কালো। সে বেবেছিল লাল। কিন্তু বলেনি। মনে মনে ভাবে ভাগ্য ভালো তার যে সে ভুল করে বলে ফেলেনি। গরুর গায়ের রঙ চিনে নিয়ে মনে মনে বিড় বিড় করতে করতে রাজ দরবারে উপস্থিত হয়।)
– রাজাঃ হাঁ, তো দেখে এসেছো হরিপদ (গোয়ালার নাম)? এবার বল বাছুরটির গায়ের রঙ কি?
– গোয়ালাঃ আজ্ঞে হুজুর কালো রঙের বাছুর।
– রাজাঃ বাছুরটি মেয়ে না পুরুষ?
– গোয়ালাঃ তা তো দেখিনি হুজুর। আহা করেছ কি? ঠিক আছে আবার যাও।

(গোয়ালা হন্তদন্ত হোয়ে আবার পাল পাড়ায় ছুটে যায়। গিয়ে দেখে বাছুরটি মেয়ে বাচ্চা)

– রাজাঃ তো হরিপদ বল কি লিঙ্গের বাচ্চা দেখলে?
– গোয়ালাঃ মেয়ে বাচ্চা হুজুর।
– রাজাঃ ভাল কথা। তো গাভীটি এখন কত সের (তখনকার দিনে সের ছিল, কেজি ছিল না) করে দুধ দিচ্ছে?
– গোয়ালাঃ (হাত কচলাতে কচলাতে মুখে কোন রকমে আমতা আমতা করে বলে) তা তো জেনে আসিনি হুজুর। আমাকে ক্ষমা করুন আমার ভুল হয়ে যাচ্ছে।
– রাজাঃ আহা ঠিক আছে। তুমি না হয় আর একবার যাও। যেয়ে শুনে আসো।
গোয়ালা একবারে ফীডব্যাক দিতে পারে না। রাজার সারা দিনের রাজ্যের কাজের ক্ষতি হয়। তবুও ধৈর্য ধরে সকলের জন্য একটা প্রাসঙ্গীক জ্ঞান এবং প্রয়োজনীয় উপদেশ রাখার জন্য রাজা বসে থাকেন। গোয়ালার ভুল ভাঙ্গার জন্য এবার রাজা মশায় দরবারের এক কোনে গোয়ালাকে বসিয়ে উজিরকে তলব করেন। উজির দরবারে হাজির হলে রাজা মশায় উজিরকে জিজ্ঞাসা করেনঃ
– রাজাঃ উজির মশার আপনার রাজ্যে ধারে কিনারে পাল পাড়ায় যে একটা গাভী বাচ্চা প্রসব করে তা আপনি জানেন?
– উজিরঃ জ্বী রাজা মশায়। পালপাড়ায় বরুণ পালের একটি গাভীর বাচ্চা হয়েছে সেটা জানি। কিন্তু আজ যাব যাব করে এখনও সময় পাইনি তাই যাওয়া হয়নি।
– রাজাঃ তা বেশ। আপনি এ মুহুর্তে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবেন।
উজির প্রস্থান করেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই দরবারে ফিরে আসেন। রাজা এবার যে যে বিষয়গুলো জানতে চেয়ে বার বার গোয়ালাকে পাঠিয়েছিল সে সব বিষোয়ে জানতে চান। উজির মশায় একবার দেখে এসে সব বলে দিলেন। শুধু তাই নয় , সাথে এও বললেন গাভীটি এই প্রথমবারের মত প্রসব করেছে। খুব কষ্ট হয়েছে। শেষে বৈদ্য ডেকে বাচ্চা খালাস করেছে। বৈদ্যকে পেতেও দেরী হয়েছে। গাভী মরে মরে প্রায়। রাজ্যে পশু পাখিদের বৈদ্যের সংখ্য একটু কম রাজা মশায়। রাজ্যে এই বৈদ্যদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য একটু সুদৃষ্টি দেয়া দরকার বলে মনে করি রাজা হুজুর।
রাজা এবার গোয়ালার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই দেখে গোয়ালা সাষ্টাঙ্গ প্রনামে ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে কাঁদছে আর প্রান ভিক্ষা চাচ্ছে। বলছে তার ভুল হয়ে গেছে সে বুঝেনি কেন মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতার নিরিখে একজন মানুষ আর একজন মানুষ থেকে অধিক ভালোবাসার, সম্মানের এবং মূল্যবান হয়ে থাকে।
০৬ জুন, ২০২৩।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD