মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩৪ অপরাহ্ন

ছোটোগল্প।মাধবীলতা -লিজি আহমেদ

মাধবীলতা,
ছোট গল্প ( সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে)
লিজি আহমেদ

বহু দিন হয়ে গেলো সামান্য একটু বৃষ্টিরও দেখা নেই। প্রচন্ড খরায় বুকটা যেনো পুড়ে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে,মনটাও বড্ড হু হু করছিল রঞ্জুর। বাস থেকে নেমে রজত কাকার সাইকেলে চেপে সে যখন গাঁয়ের পথে ঢুকছে সে সময় বাঁশবনের পেছনে সূর্যটা একটু ঢলে পড়েছে। ঝিরিঝিরি পাতার কাঁপনের ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পেলো আকাশে বেশ মেঘ করেছে। লাল মাটির রাস্তা ধরে যেতে যেতে দেখলো দুপাশে আবীরের মত ছড়িয়ে আছে কৃষ্ণচূড়া ফুলের মন্জুরি।

রজত কাকা বকবক করেই চলেছেন,”মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেলেও তোর মা তোর কথাই বলত সারাটা দিন। কত বড় হবার কথা ছিল তোর বল! তোর মত বেশি নম্বর পেয়ে এই গাঁয়ে কেউ কি পাশ করেছে ? রুপাটাও কত ভালো ভালো সম্বন্ধ পায়ে ঠেলে দিয়েছে। শহরে চলে যেতে হবে তাই বিয়ে করব না বলে গো ধরে বিয়ের বয়েস পার করে দিল। এ গাঁয়ে থেকে যাবার জন্যই তো ! শেষমেশ সুধীন কেই বিয়ে করলো। সুধীন কি ওর যোগ্য ছিল ? শুধু তোর মায়ের শেষ দিনগুলোতে কাছে থাকবার জন্য। তবুও তো শেষ রক্ষা হলো না! ”

এই মুহূর্তে রন্জুর পুরনো ব্যর্থতার কথা শুনতে ভালো লাগছে না। সে বলে ওঠলো,
“থাক না কাকা ! বাদ দাও তো ওসব কথা। তুমিও তো লোকের কত কথা শুনেছ। তবুও অনেক করেছ মায়ের জন্য। এ গাঁয়ে আপন বলতে তো তুমি আর রুপা ছাড়া মায়ের আর কেউ ছিলও না।”

দেখতে দেখতে আঁধার নেমে এলো চারপাশে।অন্ধকার রাস্তাটায় হাজার হাজার জোনাকি জ্বলছে। কাছেই কোনো বাড়ীতে বুঝি ভাত রাঁধা হচ্ছে। গরম ভাতের ফেনা ফেনা গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। কয়েকটি কুকুর ঝগড়ায় মেতেছে খুব। কে যেনো টিউবওয়েল থেকে পানি তুলছে ঘট – ঘটাং,ঘট-ঘটাং। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির উঠোনে পা রাখে রন্জু।

গাঁয়ে বোধহয় রাত একটু তাড়াতাড়ি নামে। ছড়ানো ছিটানো বাড়ি ঘর। সন্ধে হবার সাথে সাথেই রাত। সেই রাত একটুখানি গড়াতে না গড়াতেই গভীর রাত। তেমনি এক রাত নেমে এসেছে এই বাড়িতে। রন্জু রজত কাকাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে দিয়ে নিজে বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে।

রন্জুর মা মাধবীলতা বহুদিন ধরে একাই ছিলেন এ বাড়িতে। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন ছেলেই একে একে বিয়ে করে শহরেই সংসার পেতেছে। তারা মা আর রন্জুর খোঁজ-খবর রাখত না বললেই চলে। রন্জু মেধাবী ছেলে। এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় গিয়ে টিউশানি করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। বাবার জমিজমা বড় ভাইরা ভাগ করে নেবার পর তার ভাগে যা পেয়েছে সেটা দিয়েই মা-ছেলের সংসার চলে যেত। অশান্তি বা অভাব কোনোটাই তেমন ছিল না ওদের।

ওদের গ্রামটাও ছবির মত সাজানো সুন্দর। বাড়ীর একপাশে একটা পুকুর। পুকুরের পাড় ধরে বড় বড় সব গাছের সারি। রন্জুর ঘরের প্রায় গা ছুঁয়ে একটা ঝাকড়া অশত্থ গাছ। কৃষ্ণচূড়া,দেবদারু,মহুয়া, হরিতকী আরও কত কি যে গাছ ! এই গাঁয়ে হেসে,খেলে,ছুটোছুটি করে একসাথে বেড়ে উঠেছে রন্জু,রুপা ও গাঁয়ের আরও কিশোর -কিশোরীরা। রুপার ভেতর মেয়েলিপনা ছিল না। ছেলেদের মতই বলিষ্ঠ ছিল সে। দূরন্ত,ডানপিটে হলেও ছিল ভীষণ প্রতিভাময়ী। রন্জুও কিশোর বয়স থেকেই ছিল দুর্দান্ত মেধাবী, খুব ভাবুক আর প্রকৃতি প্রেমিক। কোন গাছের নাম কি, কোন পাখির নাম কি, হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছিল রুপাকে। এই গাঁ ছিল ওদের প্রাণ। একে ছেড়ে যেতে চায় নি ওরা কেউই কোনোদিন।

কিন্তু লেখাপড়া শেষে রন্জুকে জীবিকার তাগিদেই শহরে যেতে হয়। তবু সুযোগ পেলেই ছুটে আসে প্রাণের টানে তার গাঁয়ে, মায়ের কাছে। রুপারও বয়স থেমে নেই। তাও আবার গাঁও-গেরামের ব্যাপার। সম্বন্ধ আসতে থাকে। রুপা বেঁকে বসে। বিয়ে সে করবে না। রন্জুও ভাবলেশহীন, উদাসীন। সে ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসারী হবে না। তার ধারণা বিয়ে করে সংসারী হয়েই ভাইয়েরা মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। সে মাকে একলা করে দিতে পারবে না। কিছুতেই না। পৃথিবীর সব ধরণের “ভালোবাসার” জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ সৃষ্টি হয় নি। একটি শব্দ দিয়েই বোঝানো হয়ে থাকে সব ধরণের “ভালোবাসা।” কিন্তু সব ভালোবাসা যে এক না রুপাকেও আর বোঝানো হয় না রন্জুর।

পরিবারের চাপে রুপা একদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়। বাবার বাড়ি ছেড়ে যেতে সব মেয়েরাই বিয়ের দিন কাঁদে কিন্তু রুপার কান্না ছিল ভিন্নরকম। মনে হয়েছিল তার আর জীবনের প্রতি কোনো সাধ নেই। অশ্রুর ভেতর দিয়ে বুঝি তার প্রাণটা গলে গলে পড়ছে।

রজত চৌধুরী বেশ অভিজাত ঘরের একমাত্র সন্তান ছিলেন। তার বাবা তাকে জার্মানীতে লেখাপড়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। লেখাপড়া শেষ করে তিনি সেখানে এক বিদেশীনিকে বিয়ে করলেও সে সংসার বেশিদিন টেকেনি। নোঙ্গর ছেঁড়া জাহাজের মত ঘুরে বেড়িয়েছেন বহু দেশ থেকে দেশান্তরে। কিন্তু আর সংসারী হন নি। কোথাও থিতুও হননি। প্রবীণ বয়সে তিনি বাবার ভিটেতেই ফিরে এসেছেন। রান্না-বান্না বা ঘর গৃহস্থালির লোক পাওয়া গেলেও মাঝে মাঝে তারও ইচ্ছে করত আপন কারও হাতের রান্না সর্ষে বাটা দিয়ে সজনা চচ্চড়ি, চিংড়ি দিয়ে লাউয়ের ঘন্ট অথবা শুঁটকি ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে। মাধবী এ ধরণের কিছু রাঁধলে রন্জু তাকে ডেকে নিয়ে যেত। পাড়ার দাদা হিসেবে মাধবীর বিপদ-আপদেও সবচেয়ে আগে এসে দাঁড়াতেন রজত। আত্মীয় না হয়েও ওরা সমাজকে উপেক্ষা করেই এক অলিখিত চুক্তিতে পরমাত্মীয়ের মত জীবন-যাপন করে আসছিলেন। সমাজ তাদের বিপদের খোঁজ না রাখলেও বন্ধু ভেবে এমনি ভাবে কেউ কারও পাশে থাকাটাও সমাজের কাছে অসহনীয়। কিন্তু বন্ধুর মত এমন মানুষকে উপেক্ষা করার সাহস তাদের করোই ছিল না। তারা ছিলেন টলটলে, শান্ত,স্থির জলরাশির মত। যেখানে যৌবনের উত্তাপ নেই,শুধুই বার্ধক্যের হীম শীতলতা।

এভাবেই হয়ত কেটেও যেত আরও অনেকগুলো দিন। কিন্তু বিধিবাম। হঠাৎই মাধবীলতার এলোমেলো লাগে সবকিছু। ঘরের কিছুই নিজের মনে হয় না। কেউ সামনে এলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। কারও সাথে বেশি কথাও বলে না। খাওয়া,গোসল,ঘুম,রাত-দিনের কিছুরই হিসাব থাকে না। অনেক রাত অবধি উঠোনে বা বারান্দায় বসে কি যেনো ভাবে। এদিক-সেদিক হেঁটে চলে যায়। সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়। মাধবীলতার বহুদিনের পরিপাটিভাবে গোছানো জগতটা নিমেষেই অগোছালো হয়ে যায়।

খবর পেয়ে ছুটে আসে রন্জু। শহরে নিয়ে ডঃ দেখায়। কিন্তু কোনো উন্নতি হয় না। সারাক্ষণ মা কে দেখাশোনার জন্য লোক রেখে দেয়। তবুও শেষ রক্ষা হয় না। বেশ কিছুদিন এভাবেই কেটে যায়। একদিন ভোরে গৃহপরিচারিকার ভয়ার্ত চিৎকারে ছুটে আসে আশেপাশের গ্রামবাসী। ছুটে আসেন রজত চৌধুরী। সবাই হতবাক হয়ে দেখেন বাড়ীর পাশের পুকুরের ভেতর ভেসে আছে মাধবীলতা।

অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বহুদিন পর শরীর মন শীতল করা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। বৃষ্টির ছাট এসে শরীরে লাগছে তবু বারান্দায় বসে থাকা দু’জন মানুষের প্রাণ জুড়াচ্ছে না। ভিজছে ধান ক্ষেত,পাট ক্ষেত, ভিজছে খেজুর গাছ,বাবলা গাছের ঝোঁপঝাড়। কচুরিপানা, ভাঙা গাছের ডাল,আবর্জনা ভাসছে পুকুরের পানিতে। উঠোন জুড়ে কি শান্তির বৃষ্টির নেমেছে!

রঞ্জুর মনে পড়ে মা সবসময় বলতো তাদের তিনভাইয়ের জন্মের ক্ষণগুলোর কথা। সব ঘটনা ভুলে গেলেও মায়েরা বোধহয় সেই ক্ষণগুলোর কথা কখনও ভোলে না। রঞ্জুর মা কি ভুলে গিয়েছিল সেই মুহূর্তগুলো! রন্জু তাকায় পুকুরটির দিকে। হয়ত মা রাত-দুপুরে বেসামাল অবস্থায় হাঁটতে গিয়েই পড়ে গিয়েছিল। ওখানে ভেসে গেছে তার জন্ম,তার শৈশব,তার বেড়ে ওঠার গল্পগুলো। হঠাৎ খুব শীতল কাঁপা কাঁপা হাতের একটা স্পর্শে পেছনে তাকায় রন্জু। “এবার একটা বিয়ে কর বাবা!” রজতকাকার মুখের দিকে স্পষ্ট করে তাকায় সে। অনুরোধ মাখা,শোকার্ত এই চেহারাটার ভেতর দিয়ে মায়ের শেষ দিনগুলোর অনুরোধ মাখা চেহারাটা যেনো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তার এতদিনে মনে হয় ভালোবাসা বোঝানোর জন্য পৃথিবীতে আসলে অনেক শব্দই সৃষ্টি হয়েছে,স্নেহ-মায়া- মমতা আরও কত কি ! তবুও কি কেউ বোঝাতে পারে এর অনুভূতি সত্যিই কতটা গভীর !

নর্থ ইয়র্ক, টরোন্টো
১৬ই জুন ২০২৩

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesbazar_brekingnews1*5k
© All rights reserved © 2020
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD